
মানুষের শরীরে স্পর্শের অনুভূতি সাধারণত আনন্দ, স্বস্তি কিংবা শারীরিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অংশ-স্তনবৃন্তে সামান্য স্পর্শ বা ঘর্ষণই উল্টো মানসিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এমন স্পর্শের পর হঠাৎ মন খারাপ, বিষণ্নতা, ভয়, শূন্যতা কিংবা অজানা এক ধরনের দুঃখবোধ তৈরি হয়। এমনকি পোশাক পরিবর্তন, গোসলের পর তোয়ালে দিয়ে শরীর মোছা কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ থেকেও এ অনুভূতি দেখা দিতে পারে। এই অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতাকে ‘স্যাড নিপল সিনড্রোম’ (Sad Nipple Syndrome বা SNS) নামে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এটি আদৌ কোনো স্বীকৃত রোগ কি না, কেন এমন অনুভূতি তৈরি হয় এবং এর পেছনে হরমোনের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্তনবৃন্তে উদ্দীপনার পর হঠাৎ নেতিবাচক আবেগ তৈরি হওয়ার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ অনলাইনে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।
প্রতিবেদনে স্যান্ড্রা ছদ্মনামে পরিচয় দেওয়া ২৮ বছর বয়সী এক নারীর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তাঁর প্রকৃত নাম প্রকাশ করেনি সংবাদমাধ্যমটি।
স্যান্ড্রা জানান, ছোটবেলায় প্রথম তিনি বিষয়টি অনুভব করেন। স্তনবৃন্তে স্পর্শ করলে কেন তাঁর মন খারাপ হয়ে যায়, তা বুঝতে পারতেন না। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন কাউকে কিছু বলেননি। কলেজে পড়ার সময় সাহস করে গুগলে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারেন, অন্য মানুষেরও একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
স্যান্ড্রার ক্ষেত্রে পোশাক পরিবর্তনের সময় হালকা ও অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা তোয়ালে দিয়ে শরীর মোছার সময় এমন অনুভূতি তৈরি হয়। কখনো তাঁর মধ্যে অজানা ভয়, পুরোনো স্মৃতির মতো বিষণ্নতা কিংবা গভীর শোকের অনুভূতি দেখা দেয়। পরিস্থিতিভেদে এ অনুভূতির তীব্রতাও পরিবর্তিত হয়। তবে তাঁর যৌনজীবনে বিষয়টি তেমন প্রভাব ফেলেনি বলে জানিয়েছেন তিনি।
কী এই স্যাড নিপল সিনড্রোম?
স্যাড নিপল সিনড্রোম এমন একটি অভিজ্ঞতা, যেখানে স্তনবৃন্তে স্পর্শ বা উদ্দীপনার পর হঠাৎ নেতিবাচক আবেগ তৈরি হয়। কেউ একে আকস্মিক বিষণ্নতা, কেউ গভীর অস্বস্তি, আবার কেউ বাড়ির জন্য মন কেমন করার মতো অনুভূতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
সাধারণত এ অনুভূতি কয়েক মিনিটের মধ্যে কমে যায়। তবে কারও ক্ষেত্রে এটি মানসিক অস্বস্তি ও বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে স্যান্ড্রাসহ চারজনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের বর্ণনায় নেতিবাচক আবেগের ধরনে কিছু মিল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া স্তন্যদানকারী মা, সমলিঙ্গের সম্পর্কে থাকা ব্যক্তি এবং পুরুষদের মধ্যেও এমন অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে।
কেন এমন হয়, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
স্যাড নিপল সিনড্রোমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণাও নেই। তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সম্ভাব্য কিছু শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
স্লোভাকিয়ার পাভল জোজেফ শাফারিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের গবেষক ড. ভ্লাদিমির ক্রাউসের মতে, স্তনবৃন্তে উদ্দীপনার ফলে শরীরে অক্সিটোসিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। মানুষের আবেগীয় সংযোগ ও সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে এই হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর ধারণা, অক্সিটোসিনের সংকেত আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ায় কোনো সূক্ষ্ম পরিবর্তন এ ধরনের নেতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এটি এখনো প্রমাণিত নয়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্তন্যদান বিশেষজ্ঞ আলিয়া ম্যাকরিনা হেইস প্রোল্যাকটিন ও ডোপামিনের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এই দুই হরমোনের কার্যক্রমে পরিবর্তন মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ডোপামিন মস্তিষ্কের পুরস্কার, আনন্দ ও প্রেরণাসংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে। আর প্রোল্যাকটিনের সঙ্গে ডোপামিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এসব হরমোনের কার্যক্রমই যে স্যাড নিপল সিনড্রোমের কারণ, তা বলার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
স্তন্যদান ও যৌনমিলনের পরও কি এমন অনুভূতি হয়?
স্যাড নিপল সিনড্রোমের সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে ডিসফোরিক মিল্ক ইজেকশন রিফ্লেক্স (Dysphoric Milk Ejection Reflex বা D-MER) নামের একটি অভিজ্ঞতার।
সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় দুধ নিঃসরণের মুহূর্তে কিছু মায়ের মধ্যে হঠাৎ বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অপরাধবোধ কিংবা শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হয়। সাধারণত দুধ নিঃসরণের সঙ্গে সম্পর্কিত এই নেতিবাচক আবেগ অল্প সময় স্থায়ী হয়।
এ ছাড়া পোস্ট-কোয়াইটাল ডিসফোরিয়া (Post-coital Dysphoria) নামের আরেকটি অভিজ্ঞতা রয়েছে। যৌনমিলন বা অর্গাজমের পর কারও কারও মধ্যে দুঃখ, উদ্বেগ কিংবা কান্নার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
তবে এই তিনটি অভিজ্ঞতার অনুভূতিতে মিল থাকলেও এগুলোর উদ্দীপক ও সম্ভাব্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এক নয়।
এটি কি মানসিক রোগ বা হরমোনজনিত সমস্যা?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্যাড নিপল সিনড্রোম এখন পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত কোনো রোগনির্ণয় নয়। একে প্রতিষ্ঠিত মানসিক রোগ কিংবা প্রমাণিত হরমোনজনিত সমস্যাও বলা যায় না।
এমনকি স্তনবৃন্তে স্পর্শের পর মন খারাপ হলেই কারও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না।
কেউ কেউ এ ধরনের অনুভূতির সঙ্গে অতীতের যৌন নির্যাতন, নিজের যৌন পরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা সঙ্গীর প্রতি অনাগ্রহের সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে এসব ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ফলে এমন অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তির অতীত বা সম্পর্কের সমস্যার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
কী করা উচিত?
এ ধরনের অনুভূতি হলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কোন পরিস্থিতিতে এমন অনুভূতি তৈরি হচ্ছে, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং কোন ধরনের স্পর্শে অস্বস্তি বাড়ছে, তা খেয়াল রাখা যেতে পারে।
যৌন ঘনিষ্ঠতার সময় এমন অভিজ্ঞতা হলে সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি। প্রয়োজনে যে ধরনের স্পর্শে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা এড়িয়ে চলা বা সাময়িক বিরতি নেওয়া যেতে পারে।
তবে এ ধরনের অনুভূতি বারবার হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে স্তন্যদানকারী মায়েদের D-MER-এর ক্ষেত্রে ঠান্ডা পানি পান করা কিংবা ঘাড়ে ঠান্ডা সেঁক দেওয়ার মতো কিছু পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পদ্ধতি স্যাড নিপল সিনড্রোমের ক্ষেত্রে কার্যকর কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
আরও গবেষণার প্রয়োজন
স্যাড নিপল সিনড্রোম নিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনলাইন আলোচনা বাড়লেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিষয়টি এখনো অনেকটাই অজানা। এর প্রকৃত কারণ, হরমোনের সম্ভাব্য ভূমিকা, কত মানুষের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতা দেখা যায় এবং এর ব্যবস্থাপনা কী হতে পারে-এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সুতরাং, স্তনবৃন্তে স্পর্শের পর হঠাৎ নেতিবাচক আবেগ তৈরি হওয়ার অভিজ্ঞতা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেলেও একে প্রতিষ্ঠিত রোগ বা হরমোনজনিত সমস্যার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনো নেই।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান