ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

সুপার এল নিনো’র করাল গ্রাসে পৃথিবী, ভয়াবহ দুর্যোগের হাতছানি

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১২ জুন ২০২৬, ৭:১০ সকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন এক সংকটে কাঁপছে পৃথিবী। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে শুরু হয়ে গেছে এল নিনোর প্রভাব, যা এবার চরম আকার ধারণ করে ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের এল নিনো ১৯৫০ সালের পরবর্তী সকল রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।

জলবায়ুজনিত এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যার ফলে চরম আবহাওয়া, বন্যা, খরা এবং তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব।

সুপার এল নিনো কী:
সাধারণত এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি জলবায়ুজনিত চক্র। যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে এল নিনো বলা হয়। কিন্তু ‘সুপার এল নিনো’র ক্ষেত্রে এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়। এনওএএ-এর বিশ্লেষণে এবারের এল নিনোর সুপার পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার ঝুঁকি ৬৩ শতাংশ।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল সমুদ্রের তাপমাত্রার বিষয় নয়, বরং এটি বায়ুমণ্ডলের বাতাসের গতিপ্রকৃতিকেও বদলে দেয়। এবারের এই উষ্ণ স্রোত প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে আসছে। এমন ঘটনা অতীতে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোগুলোর সময়েই দেখা গিয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা চরম উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০২৪ সাল ইতিমধ্যে উষ্ণতার নতুন রেকর্ড গড়েছে, তবে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, সুপার এল নিনোর তাণ্ডবে ২০২৭ সাল সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির অত্যধিক ব্যবহার এবং বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে ইতিমধ্যে উত্তপ্ত করে রেখেছে। তার ওপর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এটি কেবল শরৎকাল নয়, বরং শীতকাল পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে শীতেও অস্বাভাবিক গরমের অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।

বৈশ্বিক প্রভাব ও দুর্যোগের চিত্র: এল নিনো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া ব্যবস্থার ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। এর প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা: এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের চাপে বিশাল পরিবর্তন আসে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলে হারিকেন এবং বিধ্বংসী টর্নেডোর প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। কানাডার বিশাল অংশে শীতকালজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে, যা সেখানকার বাস্তুসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, যার ফলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হবে। এছাড়া ব্রাজিলের মতো দেশগুলোতে অসহনীয় তাপপ্রবাহ ও খরার মতো বিপরীতমুখী পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।

এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চল: এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এল নিনো এক ভয়াবহ সংকেত বয়ে আনে। ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা কৃষিপ্রধান এই দেশগুলোতে পানির স্তর নিচে নামিয়ে দেওয়া ও সেচ সংকটের ঝুঁকি তৈরি করবে। অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি এখন বিজ্ঞানীদের প্রধান চিন্তার কারণ। ইন্দোনেশিয়ার মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে বৃষ্টির অভাব এবং দাবানলের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

আফ্রিকা মহাদেশ: আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী খরার কবলে পড়তে পারে। এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ায় সেখানকার তৃণভূমি ও কৃষি জমি মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে করে খাদ্যনিরাপত্তা এবং গবাদি পশুর জীবনযাত্রা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। পানির অভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে ওঠার পাশাপাশি শরণার্থী সংকটের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ক্যারিবীয় অঞ্চল: ক্যারিবীয় দেশগুলোতে এল নিনো সাধারণত খরার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বৃষ্টির অভাবের ফলে মিষ্টি পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যেতে পারে, যা সরাসরি জনজীবন ও অর্থনীতিতে আঘাত হানবে। সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানেও এর প্রভাব পড়বে, যার ফলে মৎস্য সম্পদের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির দেশগুলো বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।

বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি: এই দুর্যোগগুলোর চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ধান, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। এর ফলে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে পানিবাহিত রোগ, হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বৃদ্ধি পাবে। বয়স্ক ও শিশুদের ওপর উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব হবে সবচেয়ে মারাত্মক। এছাড়াও বন্যার সময় দূষিত পানির সংস্পর্শে কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ভার:
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, এল নিনো কখনোই সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না; প্রতিটি ঘটনা তার নিজস্ব ধ্বংসলীলা নিয়ে আসে। তবে বর্তমানের এই সুপার এল নিনোর পেছনে বড় কারণ হিসেবে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার না কমালে পৃথিবী যে বড় ধরনের দুর্যোগের মুখে পড়তে যাচ্ছে, সুপার এল নিনো তারই একটি ভয়াবহ সংকেত। বিগত ২০১৫-১৬, ১৯৯৭-৯৮ এবং ১৯৮২-৮৩ সালে বিশ্ব একই ধরনের শক্তিশালী এল নিনোর সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের পরিবেশগত নাজুক পরিস্থিতির কারণে এবারের প্রভাব আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এনওএএ-এর জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের প্রধান বিজ্ঞানী ড. মিশেল ল্যুরেক বলেন, ‘আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রার বিন্যাসে যে পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করছি, তা ১৯৫০ সালের পরবর্তী শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। এবারের পরিস্থিতি কেবল উষ্ণ পানির উপরিপ্রবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের গভীরতর স্তর থেকেও শক্তি সঞ্চয় করছে, যা একে একটি ‘সুপার এল নিনো’র দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর স্তর থেকে আসা উষ্ণ পানির এই অস্বাভাবিক প্রবাহ বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিকে ৬৩ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংস্থাটির অপারেশনাল বিশেষজ্ঞ প্যানেল সতর্ক করে জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নাজুক অবস্থায় রয়েছে, যা এই ‘সুপার এল নিনো’কে মানবজাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Front-of-Package Labelling to Warn About Ultra-Processed Food Risks

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করবে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং

কানাডার সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

লঘুচাপের প্রভাবে সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি, এরপর আরও বাড়বে বর্ষণ

বারবার পেটের সমস্যা? হতে পারে আইবিএসের লক্ষণ

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচন

vivo Y500 Goes on Sale with Exclusive Offers

আকর্ষণীয় অফারের সাথে যাত্রা শুরু করলো ভিভো ওয়াই৫০০

MetLife Bangladesh recognizes best insurance employees in financial inclusion and customer service

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবায় সেরা বীমা কর্মীদের স্বীকৃতি দিল মেটলাইফ বাংলাদেশ

ঢাকায় আজ বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা, সামান্য বাড়তে পারে তাপমাত্রা