ঢাকারবিবার , ১ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

সুন্দরবনে মাছের মজুদ বাড়লেও হুমকিতে ৬ প্রজাতি

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩১ বিকাল

Link Copied!

মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ায় বনের নয় প্রজাতির মাছের মজুদ ঊর্ধ্বমুখী হলেও অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার, বিষটোপের ব্যবহার ও পরিবেশগত সংকটে অন্তত ছয় প্রজাতির মজুদ এখন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। তবে সার্বিকভাবে সুন্দরবনের মৎস্যভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে নতুন সাতটি প্রজাতি, যার ফলে বর্তমানে এখানে মোট ৩৮২ প্রজাতির মাছের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্যে স্বস্তি ও উদ্বেগের দুই চিত্রই উঠে এসেছে নতুন সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায়।

গবেষণার পটভূমি ও পরিধি :
বন অধিদপ্তরের ‘প্রোটেকশন অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট প্রজেক্ট (পিএসএমএফপি)’-এর অধীনে আরণ্যক ফাউন্ডেশন ও সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) যৌথভাবে ‘অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যাকুয়েটিক রিসোর্চেস অব দ্য সুন্দরবন’ শীর্ষক এই দুই বছরব্যাপী গবেষণাটি পরিচালনা করে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একদল বিশেষজ্ঞ গবেষক সুন্দরবনের জলজ সম্পদের বর্তমান অবস্থা, সার্বিক মজুদ, প্রজাতিগত প্রাচুর্য ও পরিবেশগত হুমকি মূল্যায়নে এই গবেষণা চালান।

গবেষণায় জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, শামুক-ঝিনুক সম্পদের মূল্যায়ন, মাছ ও শামুক-ঝিনুকের মজুদ মূল্যায়ন, সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের ডিএনএ শ্রেণিবিন্যাস, সুন্দরবনের অ-মৎস্য প্রজাতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ব্যবস্থাপনাগত হস্তক্ষেপ এবং নীতিগত নির্দেশনা ও বিধিবিধান সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়।

বাড়ছে ও কমছে যেসব প্রজাতি :
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সুন্দরবনের জলসীমায় বর্তমানে অলুয়া (আমাদি), পারশে, ভেটকি (কোরাল), পোয়া, দাতিনা, গ্যাগড়া টেংরা, পাঙ্গাস, হরিণা চিংড়ি এবং চাকা চিংড়ি—এই নয় প্রজাতির মাছের মজুদ সন্তোষজনকভাবে বাড়তির দিকে রয়েছে। বিপরীতে অতিরিক্ত আহরণ, মানবসৃষ্ট চাপ এবং পরিবেশগত প্রতিকূলতার কারণে মজুদ কমতির দিকে থাকা ছয়টি সংকটাপন্ন প্রজাতি হলো—পায়রা (চিত্রা/বিষতারা), নোনা টেংরা, কাইন মাগুর, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি এবং শীলা কাঁকড়া। বাকি প্রজাতিগুলোর মজুদ বর্তমানে সহনীয় বা স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে।

গবেষণার প্রধান ড. এনামুল হক জানান, আগে সুন্দরবনে ভেটকির মতো বড় আকারের মাছের প্রাচুর্য বেশি দেখা গেলেও বর্তমানে ছোট আকারের প্রজাতিগুলোর উপস্থিতি তুলনামূলক বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে বনের মৎস্যসম্পদ স্থিতিশীল থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির ওপর অতিরিক্ত আহরণের চাপ চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন ৭ প্রজাতি ও বৈচিত্র্য :
দুই বছরের এই অনুসন্ধানে প্রায় ২৬১ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়। একই সঙ্গে গবেষণায় প্রথমবারের মতো ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতির মাধ্যমে সুন্দরবনের জলসীমায় পূর্বে অনথিভুক্ত নতুন সাতটি প্রজাতি আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া মাছের প্রজাতিগুলো হলো— এক ঠোঁইটা (ডারমোজেনিস বার্মানিকা), কুলি বেলে (বাটিস হুমেরালিস), সবুজ বাইল বা ফোঁটা বেলে (এন্ট্রোগোবিয়াস ভিরিডিপাংকটাস), ফোঁটা বাট (ক্রেনিমুগিল সেহেলী) এবং বড় আইশ পারশে (প্ল্যানিলিজা ম্যাক্রোলিপিস)। এছাড়া নতুন দুটি চিংড়ি প্রজাতি হলো—মাকড়সা চিংড়ি (নেমাটোপ্যালাইমন টেনুইপেস) এবং ফোঁটা চিংড়ি (ক্লোরিডপসিস স্কোরপিও)। এই নতুন প্রজাতিগুলো যুক্ত হওয়ায় পূর্ববর্তী ও বর্তমান গবেষণার সমন্বিত তথ্যে সুন্দরবনে এখন মোট ৩৮২ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি নথিভুক্ত হলো।

রেঞ্জভিত্তিক হুমকি ও নিয়ন্ত্রণ সুপারিশ :
সুন্দরবনের অঞ্চলভেদে নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির ওপর অতিরিক্ত আহরণের চাপ চিহ্নিত করে গবেষকরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ও ব্যবস্থাপনা কৌশলের সুপারিশ করেছেন।

সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জ: সাতক্ষীরা রেঞ্জে ভেটকি মাছ এবং খুলনা ও শরণখোলা এলাকায় পাঙ্গাস মাছের অতিরিক্ত আহরণ হচ্ছে। এসব এলাকায় আহরণের কোটা নির্ধারণ, প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং পোনা রক্ষায় জালের ফাঁসের আকার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ: শরণখোলায় গ্যাগড়া টেংরা অতিরিক্ত আহরণ করা হচ্ছে। কাইন মাগুর ও শীলা কাঁকড়ার আহরণ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছানোয় সাতক্ষীরা ও চাঁদপাই রেঞ্জে কঠোর টেকসই ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

চিংড়ি সম্পদ সুরক্ষা: গলদা ও বাগদা চিংড়ির মজুদ ধরে রাখতে আহরণের ওপর কঠোর সীমা আরোপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদি, পারশে, পোয়া, দাতিনা ও চাকা চিংড়ি বর্তমানে নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে।

বিষটোপ ও পোনা ধ্বংস :
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো খালে বিষ ছিটিয়ে মাছ ধরা এবং রেণু বা পোনা আহরণ। বিষটোপ ব্যবহারের ফলে নির্দিষ্ট মাছের পাশাপাশি সম্পূর্ণ জলজ ইকোসিস্টেমের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া পোনা সংগ্রহের সময় কাঙ্খিত প্রজাতিটি রেখে অন্যান্য অগণিত ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী বিনষ্ট করে ফেলে দেওয়া হয়, যা বনের খাদ্যশৃঙ্খলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে মাছের শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটছে। সুন্দরবনের তিনটি ইকোলজিক্যাল জোন (মিঠা পানি, আধা-লবণাক্ত ও বেশি লবণাক্ত জোন) অনুযায়ী মাছের প্রাচুর্যেও তারতম্য দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত :
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংগঠনের (আইইউসিএন) সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক ও ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন প্রজেক্ট’-এর টিম লিডার ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘সুন্দরবনে কাঠ কাটা বন্ধ থাকায় এখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস মৎস্যসম্পদ। অর্থনীতি ও ইকোসিস্টেম রক্ষায় বিষটোপ দিয়ে মাছ মারা এবং ছোট পোনা ধরা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বনের জলভাগে কার্যকর নৌ-অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি প্রজননবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।’

গবেষণা দলের প্রধান ড. এনামুল হক মনে করেন, সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের মাছের অবস্থা সন্তোষজনক হলেও মানবসৃষ্ট চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার চাপ বজায় রয়েছে। তবে সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে অবৈধ শিকার রোধ করা গেলে মাছের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।

গবেষণার প্রাপ্ত সুপারিশ ও সামগ্রিক বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, সুন্দরবনে বন বিভাগের নিয়মিত তদারকি ও টহল কার্যক্রম জোরদার রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটির চূড়ান্ত কর্মশালা শেষে প্রাপ্ত নতুন সুপারিশ ও নীতিগত প্রস্তাবনাগুলো পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বন বিভাগ জালের জ্যামিতিক ফাঁস নিয়ন্ত্রণ ও আহরণ কোটা নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় সব আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সুন্দরবনে মাছের মজুদ বাড়লেও হুমকিতে ৬ প্রজাতি

বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা

ডিজিটাল সেবার অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে আসছে বাংলালিংকের ‘মুক্ত’

দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, ৪ সমুদ্রবন্দরে সতর্ক সংকেত

অতিরিক্ত উদ্বেগ কাটিয়ে সুস্থ জীবনযাপনের কার্যকরী উপায়

চাঁদপুরে পচা ইলিশ বিক্রির জন্য ব্যবসায়ীকে জরিমানা

বংশে পিসিওএস থাকলে নারীদের যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল ফি নিয়ে কড়া বার্তা মন্ত্রণালয়ের

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে নতুন উদ্যোগ

এক লাফে ভরিতে কমল ৫৪৮২ টাকা, স্বর্ণের নতুন দাম কত?

আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির আভাস

পাবনায় বজ্রপাতে নিহত ৬ জনের দাফন সম্পন্ন