প্রায় দেড় বছর সময় নরসিংদী জেলা পুলিশের সদর সার্কেলে দায়িত্ব পালন শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) যোগদানের উদ্দেশ্যে নরসিংদী ছেড়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন (শামীম আনোয়ার)। কোনো রকম আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো না হলেও পথে পথে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছেন তাদের প্রিয় পুলিশ কর্মকর্তাকে। দরদী এই পুলিশ কর্মকর্তার বিদায়ই এখন ‘টক অব দ্য নরসিংদী’।
গত নভেম্বর ২০২৪ এ নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) হিসেবে যোগদান করেন শামীম আনোয়ার। প্রায় দেড় বছরের দায়িত্ব পালন শেষে গণমানুষের ভালবাসা নিয়ে মাথা উঁচু করেই নরসিংদী ছেড়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। গত ৬ এপ্রিল বিকেলে বিদায়ের পথে জেলা শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে শতশত মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে তাকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান। বিদায়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে তার অনবদ্য কীর্তির বন্দনা। একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য এমন গৌরব ঘটনা বিরল মর্মে নাগরিক সমাজের অভিমত।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামীম আনোয়ার প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে অপরাধ দমনে কঠোর ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন শুরু করেন। বিশেষ করে নরসিংদীর বহুল আলোচিত আমেনা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূরাকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার করার ঘটনাটি তার কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশব্যাপী আলোচিত এই মামলার আসামি গ্রেফতার নিয়ে যখন নানা মহল থেকে চাপ ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছিল, তখন দ্রুত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় আনা শুধু একটি জঘন্য অপরাধের তদন্তকে এগিয়ে নেয়নি, বরং জনমনে পুলিশের প্রতি আস্থাও অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করেছে। সেসময় নবগঠিত সরকারকেও বাঁচিয়েছে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির হাত থেকে। কারণ সেসময় নুরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলে এই মামলার মূল রহস্য উদঘাটন কোনোভাবেই সম্ভব হতো না মর্মে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কার্যকর। পৌর শহরের সড়কভিত্তিক চাঁদাবাজি কিংবা মেঘনা খেয়াঘাট এলাকায় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের যে অভিযোগ ছিল, তার ধারাবাহিক অভিযানের ফলে এসব কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে। তিনিই প্রথম উদ্যোগ নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের স্থাপিত সিসি ক্যামেরা নেটওয়ার্ক গুড়িয়ে দেন। এসব সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে নির্বিঘ্নে অপকর্ম চালিয়ে যেত। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামীম আনোয়ারের নিজ হাতে একের পর এক সিসি ক্যামেরা ভাঙার দৃশ্য দেশব্যাপী ভাইরাল হয়।
একইভাবে সদর উপজেলার মদনগঞ্জ সড়কের ৫ ও ৬ নম্বর ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা ডাকাতি ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ দমনে তার উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে প্রায় নিয়মিত এসব অপরাধের ঘটনা ঘটত, সেখানে তার দায়িত্বকালে পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে এবং অপরাধের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। এছাড়া রাইড শেয়ারিং চালক কর্তৃক নারী যাত্রীকে ঢাকা থেকে নরসিংদী নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের আলোচিত ঘটনায় ভিকটিমকে উদ্ধার এবং অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তারের মাধ্যমেও তিনি জাতীয় পর্যায়ে প্রশংসিত হন।
অপরাধ দমনে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার কারণে তাকে ব্যক্তিগত ঝুঁকির মুখেও পড়তে হয়েছে। চাঁদাবাজবিরোধী অভিযানের সময় হামলার শিকার হয়ে আহত হওয়ার ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয় এবং পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা ও সমর্থনকে আরও দৃঢ় করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে খোলামেলা মতবিনিময়, পুলিশের সম্ভাব্য অনিয়ম সম্পর্কে তথ্য আহ্বান এবং নিজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জবাবদিহিতার মানসিকতা তাকে মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তার বদলির খবর প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কেউ বলেছেন, তার উপস্থিতিতে তারা নিরাপত্তা অনুভব করতেন; আবার কেউ মনে করেছেন, এ ধরনের কর্মকর্তাই দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারেন। এমনকি তার বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে সাধারণ মানুষ মানববন্ধনও করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, বিদায়ের মুহূর্তে নরসিংদীর মানুষের কাছে শামীম আনোয়ার রেখে গেছেন দায়িত্বশীল, মানবিক এবং সাহসী পুলিশিংয়ের এক অনন্য উদাহরণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার এই দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতের সৎ ও নির্ভীক পুলিশিংয়ের জন্য নিঃসন্দেহে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।


