
পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও কি সারাদিন শরীরে আলস্য আর চরম ক্লান্তি কাজ করে? অনেক সময় কাজের চাপ ছাড়াই শরীর ভেঙে পড়ে, মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয় এবং সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়। মানুষের এই চিরন্তন সমস্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা ১২টি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ তুলে ধরেছে জনপ্রিয় স্বাস্থ্য পোর্টাল ‘হেলথলাইন’। কেন মানুষ সারাক্ষণ এমন অবসাদগ্রস্ত থাকে এবং এর পেছনের মূল কারণগুলো কী, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
অপর্যাপ্ত বা নিম্নমানের ঘুম :
ক্লান্তির সবচেয়ে সাধারণ ও প্রধান কারণ হলো পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতি রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্মত গভীর ঘুমের প্রয়োজন হয়। যদি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে বা নিয়মিত কম ঘুমানো হয়, তবে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং শরীর তার শক্তি পুনর্গঠনের সুযোগ পায় না।
পুষ্টির ঘাটতি (ভিটামিন ও খনিজ) :
শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব ক্লান্তি ডেকে আনার অন্যতম বড় অনুঘটক। বিশেষ করে রক্তে আয়রনের ঘাটতি (অ্যানিমিয়া), ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২ কিংবা ম্যাগনেসিয়ামের অভাব ঘটলে শরীরের কোষগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও শক্তি পায় না, যা মানুষকে সারাক্ষণ ক্লান্ত রাখে।
ডিহাইড্রেশন বা পর্যাপ্ত পানি না পান করা :
শরীরে পানির সামান্য ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন রক্তপ্রবাহের গতি ও মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এর ফলে হৃদপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং শরীরে ক্লান্তি ও অলসতা ভর করে।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ :
ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই অতিরিক্ত কফি, চা বা এনার্জি ড্রিংক পান করেন। ক্যাফেইন সাময়িকভাবে চাঙ্গা রাখলেও এটি পরবর্তীতে রক্তে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং রাতে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি ক্লান্তি তৈরি করে।
দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ ও উদ্বেগ :
অতিরিক্ত কাজের চাপ, পারিবারিক বা মানসিক দুশ্চিন্তা শরীরের এনার্জি রিজার্ভ দ্রুত ফুরিয়ে দেয়। যখন মস্তিষ্ক সবসময় ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে থাকে, তখন শারীরিক ও মানসিকভাবে মানুষ খুব দ্রুত অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করা :
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ঠিক তত দ্রুতই আবার নিচে নেমে যায় (ব্লাড সুগার ক্র্যাশ)। এই দ্রুত ওঠানামার কারণে শরীর হঠাৎ শক্তি হারিয়ে চরম ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
খাবারে প্রোটিনের ঘাটতি :
প্রোটিন কেবল পেশি গঠনই করে না, বরং এটি শরীরের মেটাবলিজম ও শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দৈনন্দিন ডায়েটে পর্যাপ্ত প্রোটিনের অভাব থাকলে শরীরের কোষগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, ফলে ক্লান্তি ঘিরে ধরে।
অপর্যাপ্ত ক্যালোরি গ্রহণ :
ওজন কমাতে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম ক্যালোরি গ্রহণ করেন। শরীর যখন তার মেটাবলিক চাহিদার চেয়ে কম জ্বালানি পায়, তখন অভ্যন্তরীণ শক্তি কমে যায় এবং শরীর শক্তি সংরক্ষণের জন্য ক্লান্তি ও ঝিমুনি তৈরি করে।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অলস জীবনযাপন :
অনেকের ধারণা, বিশ্রাম নিলে ক্লান্তি দূর হয়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ কোনো শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করলে শরীর আরও বেশি আড়ষ্ট ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিয়মিত হালকা হাঁটাচলা বা ব্যায়াম শরীরের এনার্জি লেভেল বাড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
খাদ্য অসহিষ্ণুতা :
কিছু নির্দিষ্ট খাবার (যেমন গ্লুটেন বা ল্যাকটোজ) শরীরের সাথে ঠিকমতো খাপ না খেলে শরীরে মৃদু দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ প্রদাহের কারণে পরিপাকতন্ত্রের পাশাপাশি সার্বিক শক্তি কমে যায় এবং ক্লান্তি দেখা দেয়।
নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া :
উচ্চ রক্তচাপ, অ্যালার্জি বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘুম ঘুম ভাব বা শারীরিক অবসাদ আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সুনির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসাগত সমস্যা :
ওপরের কারণগুলো ছাড়াও থাইরয়েডের সমস্যা (হাইপোথাইরয়েডিজম), স্লিপ অ্যাপ্নিয়া, ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোম কিংবা ফাইব্রোমায়ালজিয়ার মতো কিছু জটিল মেডিকেল কন্ডিশনের কারণে মানুষ সবসময় চরম ক্লান্ত বোধ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লান্তি কেবল সাধারণ কোনো অলসতা নয়, এটি শরীরের একটি নীরব সতর্কবার্তা। যদি জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করেও দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি দূর না হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত।