
সমুদ্রের তলদেশ থেকে শুরু করে সামুদ্রিক প্রাণীর পেট—বিজ্ঞানীরা যেখানেই চোখ রাখছেন, সেখানেই মিলছে প্লাস্টিকের উপস্থিতি। তবে এবার প্লাস্টিক দূষণের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন ও উদ্বেগজনক অধ্যায়। জাপানের গবেষকরা প্রবাল ভগ্নাবশেষের সঙ্গে প্লাস্টিক তাপীয়ভাবে লেপ্টে থাকার এক অভিনব ও ভয়াভহ রূপ আবিষ্কার করেছেন। বিজ্ঞানীরা এই নতুন সংমিশ্রিত উপাদানটির নাম দিয়েছেন ‘প্লাস্টিকোর্যাল’। সাম্প্রতিক এই আবিষ্কার সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য রাসায়নিক লিচিং, আবাসস্থল ধ্বংস এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের নতুন পথ উন্মোচন করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট :
জাপানের ইউনিভার্সিটি অব রিউকিউসের গবেষক ইফেন্না ইলেখুকু এবং তার সহকর্মীরা ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপের তিনটি ভিন্ন সৈকতে রুটিন সামুদ্রিক আবর্জনা জরিপ পরিচালনা করছিলেন। সে সময়ই তাদের চোখে পড়ে অদ্ভুত এই উপাদানটি।
এ বিষয়ে প্রধান গবেষক ইফেন্না ইলেখুকু পরিবেশ ও বিজ্ঞানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মংবে’ দেওয়া এক ইমেইল বার্তায় বলেন, ‘আমরা জেনেশুনে বা কোনো পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে প্লাস্টিকোর্যাল আবিষ্কার করতে বের হইনি।’
এর আগে বিজ্ঞানীরা ‘প্লাস্টিগ্লোমারেট’ সম্পর্কে জানতেন, যা মূলত গলে যাওয়া প্লাস্টিক আবর্জনার সঙ্গে পাথর, কাঠ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের মিশ্রণ। কিন্তু ওকিনাওয়ার সৈকতে পাওয়া নমুনাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্লাস্টিক কেবল প্রবালের উপরিভাগেই আটকে নেই, বরং এটি প্রবালের সঙ্গে চিরতরে ও স্থায়ীভাবে লেপ্টে গেছে।
ইলেখুকু বলেন, ‘প্লাস্টিগ্লোমারেটের একটি উপসেট হলো প্লাস্টিকোর্যাল। তবে এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। গলে যাওয়া পলিমারগুলো আক্ষরিক অর্থেই তরল হয়ে প্রবাল ভগ্নাবশেষের অত্যন্ত জটিল ও ছিদ্রযুক্ত কঙ্কালের ভেতরে নিখুঁতভাবে মিশে গেছে।’ গবেষকদের প্রাথমিক ধারণা, সৈকতে জ্বালানো কোনো আগুনের তাপে প্লাস্টিকগুলো গলে প্রবালের সঙ্গে পুড়ে আটকে গিয়েছিল, যদিও বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
ল্যাব বিশ্লেষণে যাপাওয়া গেল :
গবেষকরা সংগৃহীত প্লাস্টিকোর্যালের নমুনাগুলো পরীক্ষাগারে নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, সংগৃহীত পাঁচটি প্লাস্টিক নমুনার মধ্যে চারটিই ছিল পলিইথিলিন, যা সাধারণত আমরা একবার ব্যবহারযোগ্য পানীয়ের বোতলে ব্যবহার করে থাকি। আর একটি নমুনা ছিল পলিপ্রপিলিন, যা খাদ্য সংরক্ষণের পাত্র এবং বোতলের ঢাকনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এই দুই ধরনের প্লাস্টিকই বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানিতে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় পাওয়া যায় এবং উত্তপ্ত করা হলে এগুলো খুব দ্রুত নরম ও বিকৃত হয়ে যায়।
পরিবেশ ও মানবদেহে মারাত্মক ঝুঁকির আশঙ্কা :
প্লাস্টিক পোড়ানো বা অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে আনা হলে তা থেকে ভয়ংকর সব রাসায়নিকের মিশ্রণ বা ককটেল নির্গত হয়। এর মধ্যে ক্যানসারের জন্য দায়ী ডাইঅক্সিন এবং সূক্ষ্ম বস্তুকণা অন্যতম, যা মানুষ ও বন্যপ্রাণী উভয়ের জন্যই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তাছাড়া প্লাস্টিক পুড়ে যাওয়ার ফলে তা অত্যন্ত দ্রুত ভেঙে অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক কণায় রূপান্তরিত হয়, যা খুব সহজেই প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশ এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষক দলটি জানিয়েছে, তারা এই প্লাস্টিকোর্যালগুলো সমুদ্রে থাকা জীবন্ত প্রবালের ওপর পাননি, বরং সৈকতে পড়ে থাকা মৃত প্রবালের ভগ্নাবশেষের ওপর পেয়েছেন। তবে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে এই মৃত প্রবালের টুকরোগুলোরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই ভগ্নাবশেষগুলোর খাঁজে খাঁজে অসংখ্য ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডী প্রাণী বাস করে। পাশাপাশি শৈবাল ও স্পঞ্জ এগুলোর গায়ে উপনিবেশ গড়ে তোলে, যা ছোট মাছ এবং অন্যান্য বড় প্রাণীর জন্য ক্ষুদ্র আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। যখন প্লাস্টিক গলে প্রবালের এই ছিদ্রযুক্ত উপরিভাগ ঢেকে দেয়, তখন প্রবাল ভগ্নাবশেষগুলো আর তাদের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক সাবস্ট্রেট বা আধার হিসেবে কাজ করতে পারে না।
‘প্লাস্টোসিন’ যুগের নতুন দলিল :
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের সমুদ্রগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১৯ কোটি ৯০ লাখ টনেরও বেশি প্লাস্টিক জমা হয়ে রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণেই এখন মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বিজ্ঞানীই ধারণা করছেন যে, পৃথিবী বর্তমানে একটি নতুন ভূতাত্ত্বিক যুগে প্রবেশ করছে, যাকে তারা অভিহিত করছেন ‘প্লাস্টোসিন’ যুগ বলে।
গবেষক ইলেখুকু মনে করেন, এই প্লাস্টিকোর্যালগুলো ভবিষ্যতের জন্য এক স্থায়ী বার্তা বহন করছে। তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিকোর্যালগুলো ক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীরে সাময়িক প্লাস্টিক আবর্জনা থেকে আরও দীর্ঘস্থায়ী, পাথুরে পাললিক নথিতে রূপান্তরিত হওয়ার একটি প্রাথমিক ধাপের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
গবেষক দলটির আশা, মানুষ এবং অন্যান্য গবেষকরা যৌথভাবে সব ধরনের আবর্জনা এবং বিশেষ করে এই প্লাস্টিকোর্যালের মতো নতুন হুমকিগুলো নথিবদ্ধ করতে এগিয়ে আসবেন। পরিবেশ সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে গবেষক ইফেন্না ইলেখুকু বলেন, ‘আসুন আমরা আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করে চলি, কারণ এটিই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।’ এই আবিষ্কার সামুদ্রিক দূষণ রোধে বিশ্ববাসীকে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করবে বলেই মনে করছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা।