ইলিশ রক্ষায় ক্ষুদ্র জেলেদের নিরাপদ জীবিকা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন ভোলার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, শুধুমাত্র খণ্ডকালীন সহায়তা নির্ভর সমাধান দিয়ে জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়; বরং তাদের জন্য টেকসই বিকল্প আয়ের সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এই দাবি উঠে আসে কোস্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত “শুধু খণ্ডকালীন সহায়তা-নির্ভর সমাধান নয়, চাই বিকল্প ও টেকসই আয়ের সুযোগ এবং প্রশিক্ষণ” শীর্ষক সেমিনারে, যা সোমবার (২০ অক্টোবর) কোস্ট ভোলা সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ পরিষদের সদস্য মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন উপ-নির্বাহী পরিচালক সনত কুমার ভৌমিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ ইকবাল হোসেন।
এছাড়া ভোলা প্রেস ক্লাব, কোস্টগার্ড, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও জেলে নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষুদ্র জেলেরা চরম জীবিকা সংকটে পড়ে। তাদের জন্য সরকারি সহায়তা যেমন ৪০ কেজি চাল দেওয়া হয়, তা যথেষ্ট নয় এবং অনেক সময় দেরিতে পৌঁছায়। ফলে জেলেরা মহাজনি ঋণের ফাঁদে পড়ে।
তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদি সহায়তার বাইরে গিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও ভর্তুকি কার্যক্রম সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
বক্তারা আরও বলেন, জেলেদের তালিকা সংশোধনের সময় জেলে প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রকৃত জেলেরা সরকারি সুবিধা পায়। পাশাপাশি জেলেদের জন্য আধুনিক মাছ শিকারের কৌশল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং জেলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
মোসাম্মাৎ রাশিদা বেগম, প্রকল্প সমন্বয়কারী, জিসিএ (GCA) প্রকল্প, কোস্ট ফাউন্ডেশন, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, ভোলার নিবন্ধিত জেলেদের প্রায় ৬০% প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞার সময় ২-৩ মাস আয়হীন অবস্থায় থাকে।
তিনি বলেন, “খণ্ডকালীন সহায়তা ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু জীবন বদলায় না। জেলেদের মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা নিশ্চিতে বিকল্প আয় ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।”
সনত কুমার ভৌমিক বলেন, ইলিশ হলো গভীর পানির মাছ, কিন্তু ডুবু চরের কারণে ইলিশ নদীতে আসতে পারছে না। এর ফলে প্রতিবছর ইলিশ উৎপাদন ৪.৫%-৫% হারে কমছে। এখনই সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলে পরিবারের নারী ও যুব সদস্যদের বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে ছাগল পালন, মাছ চাষ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সবজি চাষে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
জেলে নারী রিমা বেগম অভিযোগ করেন, সরকারি সহায়তার বেশিরভাগই প্রকৃত জেলেদের হাতে পৌঁছায় না। অপর এক জেলে নারী আকলিমা বেগম বলেন, “যেসব নারী আয়বর্ধনমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাদের পরিবারে জেলেরা নিষেধাজ্ঞাকালীন সময় নদীতে যায় না।”
জেলে প্রতিনিধি বশির মাঝি বলেন, “যারা নদীতে যায় না, তাদের নামে কার্ড আছে; যারা প্রকৃত জেলে, তাদের অনেকের কার্ডই নেই। ফলে তারা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত।”
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নেয়ামত উল্লাহ বলেন, “নিরাপদ বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণ জরুরি।”
অন্যদিকে সাংবাদিক নজরুল হক অনু বলেন, “ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর সীমানা স্পষ্ট না থাকায় অনেক সময় জেলেরা বৈধভাবে মাছ ধরেও আটক হন, যা মানবাধিকারের লঙ্ঘন।”
প্রধান অতিথি মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, “একসময় আমাদের নদীতে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ ছিল, এখন রয়েছে মাত্র ২৫-২৬ প্রজাতি। জেলেদের টেকসই জীবিকার জন্য সরকার বৈধ জাল, ভিজিএফ সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ হিসেবে গবাদি পশুপালনের উদ্যোগ নিচ্ছে।”
সভাপতির বক্তব্যে মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বলেন, “মহাজনি ঋণের কারণে জেলেরা নিজেরা মাছের দাম নির্ধারণ করতে পারেন না। সরকার তাদের জন্য ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করলে তারা ন্যায্য দামে মাছ বিক্রি করতে পারবে।”
তিনি আরও বলেন, “অজেলেদের দ্রুত তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে এবং প্রকৃত জেলেদের অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে।”


