
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন এখনো অনেক দূরের পথ, তবে সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়ানোর আগেই নিজের কমিউনিটির মানুষের জীবন রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন ১৯ বছরের এক তরুণ রোহিঙ্গা শরণার্থী। নাম তার ইমাম শরিফ। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বসে তিনি শুধু নিজের স্বপ্নই বুনছেন না, বরং সচেতনতার আলো ছড়িয়ে বাল্যবিয়ে ও সহিংসতা রোধে এক উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
মাত্র ১০ বছর বয়সে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেন ইমাম শরিফ। বর্তমান শিবিরে তার বেড়ে ওঠা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্য দিয়ে। ক্যাম্পের বর্তমান বাস্তবতায় নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক নেই। যারা চিকিৎসাবিদ্যা সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছিলেন, তারা সুযোগ বুঝে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ইমাম শরিফ এই শূন্যতা খুব কাছ থেকে অনুভব করেছেন। তার ভাষায়, ‘আমার সম্প্রদায়ের একজন চিকিৎসক খুব প্রয়োজন। আমি যদি ডাক্তার হতে পারি, তবে আমার সম্প্রদায়, আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারব। এটাই আমার মূল লক্ষ্য।’
চিকিৎসক হওয়ার সেই দীর্ঘ ও অনিশ্চিত পথের মধ্যেই ইমাম শরিফ এমন এক কাজ করে চলেছেন, যা একজন চিকিৎসকের জীবন বাঁচানোর কাজের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
বন্ধু ও পরিবাবের জীবন বাঁচাতে সাহসিকতার এক দৃষ্টান্ত :
ঘটনাটি প্রায় দুই বছর আগের। ইমাম শরিফ জানতে পারেন, তার ১৭ বছর বয়সী এক বন্ধু ও আত্মীয়ের বিয়ের তোড়জোড় চলছে। বিয়ের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে পরিবার। বন্ধুটি তখনো পড়াশোনা করছিল, কিন্তু এই বয়সে বিয়ে হলে তার ঘাড়ে এমন কিছু দায়িত্ব চেপে বসত, যা বহন করার মতো বয়স বা প্রস্তুতি তার ছিল না।
অন্যরা যখন নীরব ছিল, তখন ইমাম শরিফ চুপ করে বসে থাকেননি। তিনি সোজা চলে যান সেই বন্ধুর বাসায়। প্রথমে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন এবং বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ১৭ বছর বয়স বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি শিক্ষা, ভবিষ্যৎ দায়িত্ব, আর্থিক চাপ এবং অল্প বয়সে বড় দায়িত্ব নেওয়ার কারণে সৃষ্ট নানা জটিলতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
তবে বন্ধুটি প্রথম দফায় রাজি হয়নি। দমে যাননি ইমাম শরিফ। এরপর তিনি কথা বলেন বন্ধুর বাবা-মায়ের সঙ্গে। তাদের উদ্দেশ্যে ইমাম বলেন, ‘আমার বন্ধু এখন কোনো কাজ করে না, কোনো আয়ও নেই। এই মুহূর্তে বিয়ে করলে সে কীভাবে সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব নেবে? আপনাদের পরিবার এবং আপনাদের ছেলেও বড় বিপদে পড়বে।’
কোনো ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ না করে ধৈর্যের সঙ্গে তিনি তাদের কথা শোনেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো বোঝান। বাল্যবিয়ে কীভাবে পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করে, পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ায় এবং তরুণদের নানা ঝুঁকির মুখে ফেলে—তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। তার এই ধৈর্য ও বোঝানোর গুণের ফলে ধীরে ধীরে পরিবারটির টনক নড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাল্যবিয়ে বাতিল করা হয়।
আজ দুই বছর পরেও সেই বন্ধু পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, তিনি এখন নিয়মিত যোগ দেন কমিউনিটির যুব সেশনে, যেখানে তরুণ-তরুণীরা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, অধিকার, বাল্যবিয়ে এবং সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন। ইমামের এই কাজটি প্রমাণ করেছে যে, পারস্পরিক বিশ্বাস, ধৈর্য এবং আন্তরিক কথোপকথনের মাধ্যমে নিজের কমিউনিটির ভেতর থেকেই পরিবর্তন আনা সম্ভব।
‘এসএএসএ! টুগেদার’ কর্মসূচির প্রভাব :
ইমাম শরিফের এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ড (ইউএনএফপিএ) পরিচালিত ‘সাসা টুগেদার’ কর্মসূচি। প্রায় পাঁচ বছর আগে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হন ইমাম। এই প্রজেক্টের আওতায় কমিউনিটির যুবসমাজ ও স্থানীয় নেতাদের জেন্ডার সমতা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং বাল্যবিয়ে রোধের বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এই কর্মসূচির মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস—বন্ধু, পিতামাতা, প্রতিবেশী এবং একই বাস্তবতায় বসবাসকারী তরুণদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা। ইমাম শরিফ জানান, এই প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে তিনি জানতেন যে, বাল্যবিয়ে একটি খারাপ প্রথা, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক পরিণতিগুলো কীভাবে অন্যকে বোঝাতে হবে, তা তার জানা ছিল না। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি শেখেন কীভাবে জীবনের ওপর বাল্যবিয়ের কুপ্রভাব স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরতে হয় এবং দ্বিমতের মধ্যেও কীভাবে মানুষের সঙ্গে শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ বজায় রেখে কথা বলতে হয়। বন্ধুর পরিবারকে বোঝানোর সময় এই শিক্ষাটিই তার সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছিল।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ :
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বাল্যবিয়ে এখনো অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ক্যাম্পের প্রায় ২৮ শতাংশ মেয়েরই ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। অনেক সময় পরিবারগুলো ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর বা নিজেদের সন্তানকে সুরক্ষিত রাখার ভুল ধারণা থেকে গোপনে এ ধরনের বিয়ের আয়োজন করে থাকে। পাশাপাশি, নারী ও মেয়েদের সুরক্ষায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিক বা কোয়ার্টারে শুধু লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার রিপোর্টের সংখ্যা ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্যটি স্পষ্ট করে দেয় যে, রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের সুরক্ষায় ঝুঁকি কতটা প্রবল এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম কতটা জরুরি।
হার না মানা এক তরুণের গল্প :
ক্যাম্পের কঠিন বাস্তবতায় নানা সামাজিক চাপ, সীমিত সুযোগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বড় হওয়া ইমাম শরিফ চ্যালেঞ্জগুলোর ব্যাপারে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। সহিংসতা কিংবা বঞ্চনার কষ্ট তিনি নিজেও খুব ভালো বোঝেন, কারণ এই পরিবেশেই তার জীবন কাটছে। অনেক তরুণের মতো তারও রয়েছে আটকে পড়া স্বপ্ন এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া হতাশা।
কিন্তু এসব বাধা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি নিয়মিত কর্মশালায় অংশ নেন, বন্ধুদের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে কথা বলেন এবং কোনো কিশোর বা তরুণ বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে জানতে পারলেই ছুটে যান তাদের পরিবারের কাছে। বড় কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যান।
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, তা হয়তো এমন কিছু সুযোগ এবং সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে যা তার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু যে শিবিরে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানে তিনি ঠিকই নিজের লক্ষ্য পূরণ করে চলেছেন—একটি করে কথোপকথন, একটি পরিবার এবং একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যতের মাধ্যমে নিজের কমিউনিটিকে নিরলসভাবে রক্ষা করে চলেছেন।
প্রসঙ্গত, সুইজারল্যান্ডের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘রাইজিং টুগেদার’ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এই ‘এসএএসএ! টুগেদার’ কর্মসূচিটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে ইউএনএফপিএ এবং স্থানীয় সংস্থা ‘মুক্তি কক্সবাজার’।