ঢাকাশুক্রবার , ৭ অগাস্ট ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

রুল অব নাইন্স: যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয় শতাংশে

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৩ জুলাই ২০২৫, ৪:২৮ বিকাল

Link Copied!

ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা তখনো জানত না, তাদের অঙ্ক বা ইংরেজি ক্লাস হঠাৎই রূপ নিতে চলেছে এক জীবনের ভয়াবহ পাঠে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের এক মধ্যাহ্নে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান ভেঙে পড়ল ঠিক তাদের শিক্ষালয়ের মাঠে। আগুনে ঝলসে যাওয়া শরীর, ছুটে বেড়ানো আতঙ্কিত শিশু, পুড়ে যাওয়া ক্লাসরুম, আর আকাশে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া—সেই দৃশ্য যেন পুরো জাতির চোখে আগুনে পোড়ার ভয়াল সত্যকে উন্মোচিত করে দিল। এই ঘটনার মূল শোকাতুর বাস্তবতাটি নিহিত ছিল সেই শিক্ষার্থী ও কলেজ স্টাফদের শরীরে পোড়ার মাত্রায়—যা নির্ধারণ করা হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নির্মম অথচ অপরিহার্য সূত্র ‘রুল অব নাইন্স’-এর মাধ্যমে।

‘রুল অব নাইন্স’—বা ৯-এর নিয়ম—একটি চিকিৎসা-ভিত্তিক মাপকাঠি, যার মাধ্যমে আগুনে পোড়া কোনো রোগীর শরীরের কত শতাংশ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা দ্রুত নির্ধারণ করা যায়। চিকিৎসকরা জানেন, আগুনে পোড়া রোগীর প্রাণ বাঁচবে কি না, সেটি নির্ভর করে মূলত তার শরীরের কতটুকু অংশ পুড়েছে তার ওপর। ‘রুল অব নাইন্স’-এ মানবদেহকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি ভাগকে নির্দিষ্ট শতাংশে গণনা করা হয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন মানুষের একটি হাতের সামনের ও পেছনের অংশ মিলে ধরা হয় ৯%। দুই হাত মিলিয়ে সেটা হয় ১৮%। পায়ের প্রতি পা ধরা হয় ১৮% (সামনে-পেছনে)। বুক ও পেট অর্থাৎ সামনের শরীর ধরা হয় ১৮% এবং পেছনের পিঠও ধরা হয় ১৮%। মুখমণ্ডল, মাথা ও ঘাড় ধরা হয় আরও ৯%। একারণেই, কেউ যদি শুধু সামনের দিক থেকে আগুনে পুড়ে যায়, তবে এক ঝলকেই চিকিৎসক বুঝে ফেলেন তার পোড়ার মাত্রা কমপক্ষে ১৮%। যদি দুই হাতসহ সামনের অংশ পুড়ে যায়, তবে সেটি দাঁড়ায় (৯+৯+১৮) = ৩৬%। আর ৪০% এর বেশি পুড়লে, এক নির্মম বাস্তবতা তখন জড়িয়ে ধরে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে—মৃত্যুঝুঁকি গিয়ে দাঁড়ায় ৯০%-এ।

মাইলস্টোন স্কুলের ঘটনার বেলায় যেসব শিক্ষার্থী ও কর্মীরা আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের শরীরেই পুড়েছে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তারা তখনই ‘ক্রিটিক্যাল বার্ন ইনজুরি’ ক্যাটাগরিতে পড়ে যান। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোগীর শরীর থেকে দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট। চামড়ার নিচে থাকা টিস্যুগুলো শুকিয়ে যায়, রক্তচাপ পড়ে যায়, হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। শুরু হয় শরীরের ভেতরে ‘ডিহাইড্রেশন’ নামক বিপর্যয়। তারও ভয়ংকর রূপ হল ইনফেকশন।

আগুনে পোড়ার ক্ষত চর্মে থেমে থাকেনা। ক্ষতস্থান দিয়ে হাজারো জীবাণু ঢুকে পড়ে রক্তপ্রবাহে। একে বলা হয় ‘সেপসিস’। সেপসিসের ফলে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একের পর এক বিকল হতে শুরু করে। প্রথমে কিডনি, পরে লিভার, তারপর হৃদযন্ত্র পর্যন্ত থেমে যেতে পারে। আশঙ্কার বিষয় হলো, আগুনে পোড়ার পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টা রোগী মোটামুটি স্বাভাবিক আচরণ করে। তারা কথা বলে, হাঁটাচলা করে। অনেকেই আশা করেন, রোগী বুঝি সুস্থ হয়ে উঠছে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় সেই ধীর মৃত্যু: সংক্রমণ ও পানিশূন্যতার আঘাতে রোগী এক সময় আর সাড়া দেয় না।

মাইলস্টোন দুর্ঘটনার শিকার কয়েকজন শিক্ষার্থীকে যখন বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়, তখন তাদের চেহারায় ছিল বেঁচে থাকার আকুতি। কেউ হয়তো চিৎকার করছিল, কেউ নিঃশব্দে কাঁদছিল। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানতেন, তাদের অনেকেরই শরীরের পোড়ার মাত্রা পেরিয়ে গেছে সেই সীমা, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। ৪৫%, ৫০%, এমনকি ৬৫% পর্যন্ত পুড়েছে কারও কারও শরীর। ‘রুল অব নাইন্স’ তখন শুধু একটি সংখ্যা ছিল না, ছিল জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক সীমানা।

চিকিৎসার প্রতিটি মুহূর্ত সেখানে ছিল এক যুদ্ধ। একদিকে ইনফেকশন রোধ, অন্যদিকে ফ্লুইড ব্যালান্স ঠিক রাখা। প্রয়োজন হয় স্কিন গ্রাফটিংয়ের, অর্থাৎ মৃত বা জীবিত ব্যক্তির সুস্থ চামড়া নিয়ে আক্রান্তের শরীরে স্থাপন করা। কিন্তু সেটা সব সময় সম্ভব নয়। প্রথমত, বাংলাদেশের মতো দেশে বার্ন চিকিৎসার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এখনো অপ্রতুল। দ্বিতীয়ত, এত অল্প সময়ে প্রয়োজনীয় স্কিন গ্রাফটিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সম্পদও থাকে না। আবার যারা বাঁচলেও বাঁচেন, তারা সারাজীবনের জন্য বয়ে বেড়ান পোড়ার দাগ, মানসিক ট্রমা, এবং চলাফেরার সীমাবদ্ধতা।

মাইলস্টোনের ঘটনাটি আজ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি অভিভাবকের মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়: নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত ছিল? আকাশে প্রশিক্ষণ বিমান উড়ছে, নিচে শিশু-কিশোরেরা খেলছে—এই দুইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটল কেন? আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসা নিয়ে দেশে আলোচনার সূত্রপাত হয় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন সব শেষ হয়ে যায়, তখন আলোচনারই বা কী মানে থাকে?

রুল অব নাইন্স একটি বৈজ্ঞানিক পরিমাপক পদ্ধতি। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো কেবল অংক নয়, এগুলো কারও সন্তানের জীবন-মৃত্যুর হিসাব, কারও অন্ধকার ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। আমাদের সমাজে পোড়া রোগীদের জন্য যে অবহেলা রয়েছে, এই ঘটনাগুলো তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ঢাকায় বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ জন রোগী ভর্তি হয়। এর বড় একটি অংশই চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। শুধু পুড়ে মারা যাওয়ার নয়, সঠিক পরিমাপ না জানার কারণে অনেক সময় চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। তাই ‘রুল অব নাইন্স’ কেবল চিকিৎসকদের নয়, সচেতন নাগরিকদেরও জানা থাকা উচিত।

ভবিষ্যতে মাইলস্টোনের মতো দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে, তার জন্য চাই সরকারি এবং সামরিক উভয় মহলের সমন্বয়। প্রশিক্ষণ বিমান যেন জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে না উড়ে, তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বার্ন চিকিৎসা সুবিধা ছড়িয়ে দিতে হবে বিভাগীয় শহরগুলো পর্যন্ত। রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা-ব্যবস্থায় দেশের অধিকাংশ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, যেকোনো বড় অগ্নিদুর্ঘটনার পর যেন সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুত্ব বুঝে ‘রুল অব নাইন্স’ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। তাহলে হয়তো জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান একটু হলেও কমানো যাবে। আগুন ভয়াবহ, কিন্তু তার থেকে শিক্ষা না নিলে আমরা প্রতিবারই হারবো। মাইলস্টোন দুর্ঘটনা আমাদের সেই শিক্ষা দিয়ে গেল এক অমূল্য ও ভয়াবহ বাস্তবতার ভাষায়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Xiaomi Launches REDMI 17: Bigger Battery & Stronger Protection

৭,৫০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে বাজারে এলো শাওমির রেডমি ১৭

ডিএনসিসির উদ্যোগে তামাক বিক্রি ও প্রচারণার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান

ভারতে বন্যা-ভূমিধসে শতাধিক প্রাণহানি

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

জুলাইয়ে সড়কে ঝরল ৪১৬ প্রাণ, এর এক-তৃতীয়াংশ মোটরসাইকেল আরোহী

অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় পাওয়ার টিলারচালক নিহত

আগামী ৫ দিন যেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া

জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বজুড়ে বাসস্থান বদলাচ্ছে প্রজাপতি

বৃষ্টি কমছে, ফসল নষ্ট হচ্ছে-জলবায়ু সংকটে চাপে ইউরোপের কৃষকেরা

তীব্র তাপপ্রবাহে ইতালির ২৭ শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা

চরম গরমে ভুগছে যুক্তরাজ্য, বাড়ছে সরকারি সেবার সংকট