
ভরপেট খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবার ক্ষুধা লাগছে? সারাক্ষণ কিছু না কিছু খেতে ইচ্ছা করছে? অনেকেই এটিকে স্বাভাবিক মনে করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ‘হিডেন হাঙ্গার’ (Hidden Hunger) বা লুকানো ক্ষুধা। এটি এমন একটি পুষ্টিগত সমস্যা, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ক্যালরি পেলেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের ঘাটতির কারণে বারবার ক্ষুধা অনুভূত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে শুধু ভাত, রুটি বা ক্যালরিযুক্ত খাবার যথেষ্ট নয়। আয়রন, জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন বি১২, ফোলেট ও ভিটামিন ডি-এর মতো অণুপুষ্টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপাদানের ঘাটতি থাকলে শরীর পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার পরও মস্তিষ্ক তৃপ্তির সংকেত সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। ফলে পেট ভর্তি থাকলেও বারবার খিদে লাগে।
কেন হয় এই সমস্যা?
চিকিৎসকদের ভাষ্য, ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণে শরীরের বিভিন্ন হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে লেপটিন অন্যতম। এই হরমোন মস্তিষ্ককে জানায় যে শরীর পর্যাপ্ত খাবার পেয়েছে। কিন্তু ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে লেপটিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। ফলে শরীর তৃপ্তির সংকেত পেলেও মস্তিষ্ক তা ঠিকভাবে বুঝতে পারে না এবং ক্ষুধা থেকেই যায়।
অন্যদিকে জিঙ্ক ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীরে জিঙ্কের অভাব হলে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুধা অনুভূত হতে পারে। আবার ফোলেটসহ বি-ভিটামিন কার্বোহাইড্রেট, চর্বি ও প্রোটিনকে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। এসব পুষ্টির ঘাটতি থাকলে শরীর দ্রুত শক্তিহীন হয়ে পড়ে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতিতেও বাড়তে পারে খাবারের আকাঙ্ক্ষা
ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি সরাসরি ক্ষুধা না বাড়ালেও মিষ্টি, চকলেট বা জাঙ্ক ফুডের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি দেখা দিতে পারে অবসাদ, ক্লান্তি এবং মনোযোগের ঘাটতি। অনেক সময় মানুষ এসব লক্ষণকে ক্ষুধা ভেবে বারবার খাবার খেয়ে ফেলেন।
অন্য রোগেরও হতে পারে ইঙ্গিত
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্ষুধা লাগার পেছনে শুধু পুষ্টির ঘাটতিই নয়, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হাইপারথাইরয়েডিজম (অতিসক্রিয় থাইরয়েড) কিংবা অন্যান্য বিপাকজনিত সমস্যাও দায়ী হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
লুকানো ক্ষুধা এড়াতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার রাখতে হবে। আয়রন, জিঙ্ক ও বি-ভিটামিনের ভালো উৎস হিসেবে মাংস, মাছ, ডিম, শেলফিশ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, লাল কিডনি বিন, ডাল, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খাওয়া উচিত। পাশাপাশি ভিটামিন ডি-এর জন্য নিয়মিত সকালের সূর্যালোক গ্রহণ উপকারী।
পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টি পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অণুপুষ্টির ঘাটতি সময়মতো শনাক্ত করা গেলে শুধু অতিরিক্ত ক্ষুধাই নয়, পুষ্টিহীনতাজনিত নানা জটিলতাও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভরপেট খাওয়ার পরও যদি নিয়মিত ক্ষুধা লাগে, সেটিকে অবহেলা না করে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। অনেক সময় এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো রোগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।