ঢাকাসোমবার , ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • অন্যান্য

যে অভ্যাসের কারণে অবসাদের ঝুঁকি বাড়ছে কিশোর-কিশোরীদের

রঞ্জন কুমার দে
সেপ্টেম্বর ১, ২০২৫ ১০:২৭ অপরাহ্ণ । ১৪৯ জন

ঢাকার এক নামকরা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী রিমা প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই ফোন হাতে নেয়। পড়াশোনা বা খেলাধুলার সময় নেই বললেই চলে। রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতে কাটাতে ভোর হয়ে যায়। তার বাবা-মা বুঝতে পারছেন না কেন মেধাবী মেয়েটি হঠাৎ করে পড়াশোনায় অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে, ঘুমের অভাব হচ্ছে এবং সবসময় বিষণ্ণতায় ডুবে যাচ্ছে। রিমার গল্প আসলে হাজারো কিশোর-কিশোরীর জীবনের প্রতিচ্ছবি, যারা এক অদৃশ্য ঝুঁকির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে—অবসাদ বা ডিপ্রেশন।

ডিজিটাল আসক্তি: সবচেয়ে বড় দায়
আধুনিক যুগে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোর-কিশোরীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পড়াশোনা বা বিনোদন—সবকিছুতেই এর ব্যবহার থাকলেও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ডুবে থাকা কিশোরদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, নিদ্রাহীনতা এবং আত্মমর্যাদাবোধ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। অনলাইনে অন্যের ঝলমলে জীবন দেখে নিজের জীবনকে মূল্যহীন মনে করার প্রবণতা থেকে জন্ম নেয় হতাশা।

ঘুমের অভাবের প্রভাব
কিশোর বয়সে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, রাত জাগা ও পড়াশোনার চাপের কারণে অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুম পায় না। ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে, যার ফলে তারা সহজেই রাগান্বিত হয়, মনোযোগ হারায় এবং ধীরে ধীরে বিষণ্ণতায় ভোগে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম পায় না, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশনের ঝুঁকি দ্বিগুণ।

পড়াশোনার চাপ ও প্রতিযোগিতা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা কিশোর-কিশোরীদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। ভালো ফলাফল না করলে পরিবার ও সমাজে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয় তাদের সবসময় তাড়া করে। অনেকে পড়াশোনার ব্যর্থতাকে জীবনের ব্যর্থতা মনে করে হতাশ হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, যা কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

শারীরিক সক্রিয়তার অভাব
আগে যেখানে বিকেল মানেই ছিল মাঠে খেলা, এখন কিশোর-কিশোরীরা বেশিরভাগ সময় কাটায় ঘরের ভেতরে। শারীরিক কসরত বা খেলাধুলা মস্তিষ্কে এন্ডরফিন নামক সুখ হরমোন বাড়ায়, যা অবসাদ দূর করে। কিন্তু শারীরিক সক্রিয়তার অভাবে তারা সহজেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি
কিশোর বয়সে সন্তানরা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বোধ করে বাবা-মায়ের সঙ্গে খোলামেলা কথোপকথনের। কিন্তু কর্মব্যস্ত জীবনে অনেক অভিভাবকই সময় দিতে পারেন না। এর ফলে সন্তানরা নিজেদের একা মনে করে, সমস্যা কাউকে বলতে চায় না এবং মানসিক চাপ নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখে। এ জমে থাকা চাপই একসময় অবসাদে রূপ নেয়।

অনিরাপদ সামাজিক পরিবেশ
হয়রানি, বুলিং, সম্পর্কের জটিলতা, প্রেমে ব্যর্থতা—এসব বিষয়ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। স্কুলে বা অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেকেই লজ্জায় চুপ করে যায়, যার ফলে আত্মসম্মানবোধ ভেঙে পড়ে। অনেকে আবার পরিবারে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারে না, যা অবসাদকে আরও তীব্র করে তোলে।

কিশোর বয়স এমন একটি সময়, যখন তারা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক দিক থেকে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই সময়ে ভুল অভ্যাসগুলো তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। স্ক্রিন আসক্তি, ঘুমের অভাব, পড়াশোনার চাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, পারিবারিক যোগাযোগহীনতা ও অনিরাপদ সামাজিক পরিবেশ—সব মিলিয়েই কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অবসাদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

অতএব, অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোরদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের শখকে উৎসাহ দেওয়া, বাইরে খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। কেবল তাহলেই আগামী প্রজন্মকে অবসাদের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরানো সম্ভব হবে।