মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে সরকার। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল)-এর মধ্যে ১৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় প্রতি ব্যারেলে ৫ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার প্রিমিয়ামে ডিজেল আমদানি করছে বাংলাদেশ।
ভারতের শিলিগুড়ি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি এই জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী বছরে চারবার ভারত থেকে ডিজেল আসে। তবে সরকার আগামী জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করছে।
এ বিষয়ে রোববার সরকারের পক্ষ থেকে একটি কার্যপত্র পাঠানো হয়েছে বলে বিপিসির সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘যে প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে এই চুক্তি করা হয়েছিল, তা বাংলাদেশের জন্য খুব অনুকূল ছিল না। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এটি একটি যৌক্তিক উদ্যোগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।’
তিনি বিকল্প উৎস হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গেও জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যেন ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালে এই ব্যবস্থায় মোট ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন নিশ্চিতভাবে আমদানি করা হবে এবং বাকি ৬০ হাজার মেট্রিক টন প্রয়োজন অনুযায়ী আনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে ট্যাংকারে সরবরাহের তুলনায় সময় ও ব্যয়— দুই দিক থেকেই সাশ্রয়ী। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা উচিত।
এদিকে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল) সমুদ্রপথে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথম বিপিসির কাছে জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু করে এবং ২০২২ সালে সরকার-টু-সরকার সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
আইওসিএল মূলত সমুদ্রপথে ডিজেল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল ও অকটেন সরবরাহ করে থাকে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বাংলাদেশ মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার ১১৮ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টন ডিজেল এবং ৫২ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন অকটেন ছিল।
পরের বছর ২০২৪ সালে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টনে। এর মধ্যে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন ডিজেল, ১৩ হাজার ৯৮৭ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল, ৭৩ হাজার ৫১৩ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল এবং ২৬ হাজার ৬৫৫ মেট্রিক টন অকটেন ছিল।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে আইওসিএলের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৯০৭ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার ৫০২ মেট্রিক টন ডিজেল এবং ১০ হাজার ৮০৫ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ের জন্য আইওসিএলের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে সম্মতি রয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল, ১০ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল, ৫০ হাজার মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল এবং ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন অন্তর্ভুক্ত।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের ফলে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সহজ হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে এই ব্যবস্থাকে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।


