ঢাকাসোমবার , ৫ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬: কতটা নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা?

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৬ বিকাল

Link Copied!

বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সবার জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। জাতিসংঘের এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’ (Adequate Housing for All)। বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ প্রতিপাদ্যে।

৫ অক্টোবর বিশ্ব বসতি দিবস। প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার দিবসটি পালিত হয়। নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসনকে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগর গড়ে তোলার বিষয়টি এ দিবসের অন্যতম মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নগরী ঢাকা। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ রাজধানীমুখী হচ্ছে। ফলে বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ, আবাসনের চাহিদা এবং নগরসেবার ওপর নির্ভরতা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামনে আসছে যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসন ব্যয় এবং দুর্যোগঝুঁকির মতো নানা সমস্যা।

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণেও ঢাকার বড় নগর চ্যালেঞ্জ হিসেবে যানজট, দূষণ, জলাবদ্ধতা, সাশ্রয়ী আবাসনের সংকট, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মৌলিক নগরসেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ফলে শুধু নতুন আবাসন নির্মাণ নয়, একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও পরিকল্পিত ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি

ঢাকার জন্য অন্যতম বড় উদ্বেগ ভূমিকম্প। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলে অবস্থিত এবং বড় মাত্রার ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।

২০২৫ সালে ইউএনডিপি আয়োজিত এক কর্মশালায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উল্লেখ করেন, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই কর্মশালায় ভবন নির্মাণ বিধিমালা কার্যকর করা, জরুরি পরিকল্পনা শক্তিশালী করা এবং উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ কারণে ঢাকার ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ এবং জরুরি উদ্ধার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

বায়ুদূষণে বড় চাপ

ঢাকার আরেকটি বড় সমস্যা বায়ুদূষণ। IQAir-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক গড় PM2.5 ঘনত্বের হিসাবে ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক দূষিত প্রধান শহর ছিল। ওই বছর শহরটির বার্ষিক গড় PM2.5 ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম।

নগরবাসীর জন্য এর প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়; দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের ওপরও চাপ তৈরি করে। তাই বাসযোগ্য শহর নিশ্চিত করতে আবাসন ও অবকাঠামোর পাশাপাশি নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দূষণের উৎস কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।

জলাবদ্ধতা ও হারিয়ে যাওয়া জলাধার

বর্ষা এলেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকার বন্যা ও জলাবদ্ধতা-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে অতিবৃষ্টি, আশপাশের নদ-নদীর পানির উচ্চতা, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নগর জলাভূমি কমে যাওয়া এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং পূর্বাঞ্চল ও ডিএনডি এলাকার নিচু ভূমিতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকির কথাও ওই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে খাল, জলাধার ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সড়ক নিরাপত্তায়ও বড় চ্যালেঞ্জ

ঢাকার বাসযোগ্যতার সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তাও সরাসরি যুক্ত। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ঢাকায় ৪০৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২৯ জন নিহত এবং ৫১১ জন আহত হয়েছেন।

এসব দুর্ঘটনার পেছনে যানজট, অপর্যাপ্ত সড়ক অবকাঠামো, মিশ্র যান চলাচল, ফুটপাত দখল এবং পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকার মতো বিষয়গুলোও ভূমিকা রাখে। তাই বাসযোগ্য শহর মানে শুধু আবাসিক ভবন নয়; নিরাপদ ফুটপাত, পথচারীবান্ধব সড়ক, কার্যকর গণপরিবহন ও সুশৃঙ্খল যান চলাচলও এর অংশ।

ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রয়োজন

রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে দেশের অন্যান্য শহর ও নগরকেন্দ্রকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৮ শতাংশ; ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের চাপ কমাতে দ্বিতীয় সারির শহরগুলোতে জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, ঢাকাকে বাসযোগ্য করার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য শহরেও শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও নাগরিক সেবার সুযোগ বাড়াতে হবে। এতে রাজধানীমুখী মানুষের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

তাহলে কতটা নিরাপদ ঢাকা?

ঢাকাকে এক কথায় ‘নিরাপদ’ বা ‘অনিরাপদ’ বলার মতো কোনো একক বৈজ্ঞানিক সূচক নেই। তবে ভূমিকম্প, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, আবাসন ব্যয় এবং নগরসেবার ওপর বাড়তে থাকা চাপ-এসব সূচক বলছে, রাজধানীর বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এখনো বড় ধরনের কাজের সুযোগ রয়েছে।

বিশ্ব বসতি দিবসের ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’ এবং বাংলাদেশের ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’-দুই প্রতিপাদ্যই মূলত শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগর গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা সামনে আনে।

ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য করতে তাই ভবন নির্মাণ বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ, ভূমিকম্প প্রস্তুতি, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, খাল-জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপদ সড়ক ও গণপরিবহন এবং রাজধানীর বাইরে পরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তা শুধু তার ভবনের সংখ্যা দিয়ে নয়-নাগরিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ, সেবা ও জীবনযাত্রার মান দিয়েই নির্ধারিত হয়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

উপকূলের ১৪ জেলায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬: কতটা নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা?

পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস যৌথভাবে কাজ করবে

কোম্পানির হস্তক্ষেপ তামাক নিয়ন্ত্রণের বড় বাঁধা

realme C100 Set to Bring All-round Durable Champion 8000mAh Titan Battery

অলরাউন্ড ডিউরেবল চ্যাম্পিয়ন ৮,০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার টাইটান ব্যাটারি নিয়ে আসছে রিয়েলমি সি১০০

মানিকগঞ্জে বাসচাপায় তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি নিহত

আজ বিশ্ব বসতি দিবস

বৃষ্টির পর তেঁতুলিয়ায় শীতের আমেজ, তাপমাত্রা নামল ২০ ডিগ্রিতে

হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ৩ মৃত্যু

ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ২ হাজার ৮৯

সরকারি হাসপাতাল তদারকিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৫৪ কর্মকর্তা