
বিশ্বের সুখ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৪তম। জাতিসংঘের আওতাধীন ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৪’-এ প্রকাশিত এই তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান বেশ নিচে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে নাগরিকদের জীবনমান, আয়, সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্নীতির মাত্রা, সামাজিক আস্থা, এবং স্বাস্থ্য ও স্বাধীনতা অনুভূতির ভিত্তিতে।
রিপোর্টে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে কম সুখী দেশ হিসেবে তালিকার একদম নিচে রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির অবস্থান ১৪৭তম, যা টানা কয়েক বছর ধরে বিশ্বে সবচেয়ে অসুখী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, নারী অধিকারহীনতা, এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আফগান জনগণের জীবনকে সংকটময় করে তুলেছে।
আফগানিস্তানের পরেই রয়েছে সিয়েরা লিওন (১৪৬), লেবানন (১৪৫), মালাউই (১৪৪), জিম্বাবুয়ে (১৪৩), বতসোয়ানা (১৪২) এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (১৪১)। এসব দেশের অধিকাংশই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য, এবং মৌলিক সেবার অভাবে জর্জরিত। একইভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন (১৪০) ও আফ্রিকার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কোমোরোস (১৩৯) জনগণের জীবনযাত্রায় চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৪তম হওয়ায় দেশটি সুখের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নমুখী পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেশী ভারত ১১৮তম, শ্রীলঙ্কা ১৩৩তম, এবং পাকিস্তান তালিকার আরও নিচে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের অবস্থান খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি মানুষের সুখবোধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সামাজিক আস্থা ও পারস্পরিক সহায়তার মাত্রা যেখানে বেশি, সেখানকার মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি সুখী। এই ক্ষেত্রে উত্তর ইউরোপের দেশগুলো যেমন ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশেই সামাজিক আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ কম, যা সরাসরি মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও সুখে প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সুখ সূচক বাড়াতে হলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃতি এবং নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার উদ্যোগ। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মানসিক চাপ ও কর্মসংস্থানের অভাব দূর করা গেলে দেশের সামগ্রিক সুখ সূচক অনেকটাই উন্নত হতে পারে।
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট মূলত একটি বার্ষিক গবেষণা, যা জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের (SDSN) তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়। এতে প্রতিটি দেশের নাগরিকদের জীবনের সন্তুষ্টি ১০-এর মধ্যে স্কোর আকারে নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কেবল সুখের মান মাপা নয়, বরং নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা—যাতে অর্থনৈতিক সূচক ছাড়াও মানুষের মানসিক ও সামাজিক কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের অবস্থান এই প্রতিবেদনে আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। উন্নয়নের নানা সূচকে এগিয়ে গেলেও, মানুষের মুখে হাসি ফেরাতে হলে রাষ্ট্রকে এখন মানুষের সুখ, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের দিকেও আরও মনোযোগ দিতে হবে।