একটা সময় ছিল, যখন ভূগোল মানেই ছিল পাহাড়, নদী আর সমুদ্রের ম্যাপ ঘেঁটে দেখা। কিন্তু কেউ যদি বলে, একটি দেশ তার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে কয়েক লক্ষ দ্বীপ নিয়ে অবস্থান করছে—তবে অবাক হওয়ারই কথা। হ্যাঁ, বাস্তবে এমন একটি দেশ রয়েছে—সুইডেন। দেশটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দ্বীপের অধিকারী। বিশ্বব্যাপী দ্বীপের সংখ্যা অনুযায়ী শীর্ষ দশটি দেশের তালিকায় ইউরোপ, এশিয়া, আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের দেশগুলো রয়েছে, কিন্তু সবার উপরে সুইডেনই।
সুইডেনের দ্বীপসংখ্যা ২,৬৭,৫৭০। দেশটির রাজধানী স্টকহোম গড়ে উঠেছে ১৪টি দ্বীপের উপর, যেগুলো পরস্পর সংযুক্ত ৫০টিরও বেশি সেতুর মাধ্যমে। এই শহরটি এক স্বতন্ত্র জ্যামিতির উদাহরণ, যেখানে নগর পরিকল্পনা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে। সুইডেনের অধিকাংশ দ্বীপ জনবসতিহীন হলেও এসব দ্বীপে রয়েছে প্রচুর জীববৈচিত্র্য, বনাঞ্চল ও হ্রদ। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপদ্বীপের এই অঞ্চল শুধু সৌন্দর্যেই নয়, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নরওয়ে, যার দ্বীপসংখ্যা ২,৩৯,০৫৭। দেশটির উপকূল রূঢ়, দীর্ঘ এবং অসংখ্য উপদ্বীপে পরিপূর্ণ। “ফিয়র্ড ল্যান্ড” নামে পরিচিত নরওয়ে মূলত বরফাবৃত দ্বীপ, উঁচু পাহাড় আর গভীর উপসাগরের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। এখানকার অনেক দ্বীপ বছরের বড় একটি সময় বরফে ঢেকে থাকে, কিন্তু গ্রীষ্মকালে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে হাজারো পর্যটক সেখানে ভিড় করে।
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড। দেশটিতে রয়েছে ১,৭৮,৯৪৭টি দ্বীপ। ফিনল্যান্ডকে বলা হয় ‘ল্যান্ড অফ আ থাউজেন্ড লেকস’। তবে শুধু হ্রদ নয়, এই দেশটি মূলত দ্বীপের দেশ হিসেবেও পরিচিত। বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্কিপেলাগো সি (Archipelago Sea) অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্যতম দ্বীপঘন অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। এখানে রয়েছে কয়েক হাজার ছোট-বড় দ্বীপ, যেগুলোর কিছুতে মানুষ বসবাস করে এবং কিছু দ্বীপ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অবস্থায় রয়েছে।
কানাডা রয়েছে তালিকার চতুর্থ স্থানে, যার দ্বীপসংখ্যা ৫২,৪৫৫। উত্তর আমেরিকার এই বৃহৎ দেশটির হাডসন বে, নিউফাউন্ডল্যান্ড ও আর্টিক অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার দ্বীপ। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দ্বীপ “বাফিন আইল্যান্ড”। অনেক দ্বীপ এতই প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত যে সারা বছর সেগুলো বরফে আচ্ছাদিত থাকে।
চিলি রয়েছে তালিকার পঞ্চম স্থানে, যার দ্বীপসংখ্যা ৪৩,৪৭১। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের প্যাটাগোনিয়া অঞ্চল এবং ফিয়র্ড উপকূল এলাকা অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এসব দ্বীপ অনেক সময়েই আবহাওয়া ও পরিবেশগত গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। চিলির অন্যতম বিখ্যাত দ্বীপ হচ্ছে ইস্টার আইল্যান্ড, যেখানে রহস্যময় মূর্তির সারি হাজার বছর ধরে গবেষকদের কৌতূহল জাগিয়ে রেখেছে।
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে রয়েছে ১৮,৬১৭টি দ্বীপ। আমেরিকার দ্বীপগুলো বেশিরভাগই হাওয়াই, আলাস্কা, গ্রেট লেকস অঞ্চল ও ফ্লোরিডা উপকূল জুড়ে বিস্তৃত। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ মূলত আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে সৃষ্টি এবং এখানকার প্রত্যেকটি দ্বীপের রয়েছে আলাদা ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।
সপ্তম স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, যা প্রায়ই ‘বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপদেশ’ হিসেবে পরিচিত। দেশটিতে রয়েছে ১৭,৫০৪টি দ্বীপ। এর মধ্যে প্রায় ৬,০০০ দ্বীপে মানুষের বসবাস রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপসমূহ—যেমন জাভা, সুমাত্রা, বোর্নিও, সুলাওয়েসি ও নিউ গিনি—বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। দেশের রাজধানী জাকার্তা নিজেই একটি দ্বীপে অবস্থিত।
অষ্টম স্থানে রয়েছে জাপান, যেখানে রয়েছে ১৪,১২৫টি দ্বীপ। জাপানের চারটি প্রধান দ্বীপ—হোনশু, হোক্কাইডো, কিউশু ও শিকোকু—সবচেয়ে বেশি পরিচিত হলেও আরও কয়েক হাজার ছোট-বড় দ্বীপ রয়েছে দেশটির নিয়ন্ত্রণে। জাপানের দ্বীপগুলো ভূমিকম্পপ্রবণ হলেও এখানকার নাগরিকরা প্রযুক্তিগতভাবে অনেক আধুনিক ও প্রস্তুত।
অস্ট্রেলিয়া তালিকার নবম অবস্থানে রয়েছে, যার দ্বীপসংখ্যা ৮,২২২। যদিও মূল ভূখণ্ড একটি মহাদেশ হিসেবে বিবেচিত, তবুও দেশটির চারপাশে অসংখ্য দ্বীপ ছড়িয়ে রয়েছে। তাসমানিয়া, ফ্রেজার আইল্যান্ড, কাংগারু আইল্যান্ডসহ বহু দ্বীপ রয়েছে পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
দশম স্থানে রয়েছে ফিলিপাইন, যার দ্বীপসংখ্যা ৭,৬৪১। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি সম্পূর্ণরূপে দ্বীপসমূহের উপর ভিত্তি করে গঠিত। এর মধ্যে মাত্র ২,০০০টির মতো দ্বীপে মানুষের বসতি রয়েছে। লুজন, মিন্দানাও, ও ভিসায়াস দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলের ভেতর দিয়েই দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি প্রবাহিত হয়।
এই তথ্যগুলো এসেছে World Atlas, Geospatial Information Authority of Japan এবং Chilean Military Geographical Institute-এর তথ্যভাণ্ডার থেকে। দ্বীপের সংজ্ঞা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—“Landmasses permanently above water not considered continents”—অর্থাৎ যে সকল স্থলভাগ স্থায়ীভাবে পানির উপরে রয়েছে কিন্তু মহাদেশ হিসেবে গণ্য হয় না, সেগুলোকেই দ্বীপ হিসেবে ধরা হয়েছে।
প্রতিটি দ্বীপই একটি স্বতন্ত্র জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং ভূরাজনীতির ধারক। দ্বীপগুলো কখনও দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কখনও পর্যটন শিল্প, আবার কখনও ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এক একটি জাতির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর দ্বীপসমূহ শুধু একটানা ভূখণ্ড নয়, বরং প্রতিটি দ্বীপ একটি করে গল্প—একটি করে সভ্যতা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলেছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাস।


