ঢাকাশনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বন ধ্বংসে বিপন্ন বন্যপ্রাণীর জীবনযাত্রা, বাধ্য হয়ে আসছে লোকালয়ে

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ সকাল

Link Copied!

কখনো ঘরের সিলিংয়ে বিশাল অজগর, কখনো জলাশয়ে মাছ ধরার জালে বড় আকারের দাঁড়াশ, আবার কখনো বসতঘরের কোণে বিষধর শঙ্খিনী সাপের আতঙ্কজনক উপস্থিতি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে চরম শঙ্কিত করে তুলছে। খাদ্যাভাব আর নিরাপদ আশ্রয়ের তীব্র সংকটে পড়ে বন্যপ্রাণীরা বন ছেড়ে বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ছুটে আসছে। এমন সব ঘটনা ঘটছে চা-বাগান, সবুজ টিলা, বনভূমি ও জলাভূমিবেষ্টিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায়।

অথচ এই দুই উপজেলা কেবল প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের জন্যই পরিচিত নয়, এটি দেশের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল আধার। কিন্তু সম্প্রতি এই জনপদের দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য এক গভীর ও মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। নির্বিচারে বনভূমি দখল, আবাসস্থলে মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশ, বনের বুক চিরে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং কৃষি সম্প্রসারণের ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ও সুরক্ষাবলয় হারাচ্ছে।

# নির্বিচারে বনভূমি দখল ও আবাসস্থল ধ্বংস করছে মানুষ
# খাদ্যাভাব ও আশ্রয়ের সংকটে লোকালয়ে আসছে প্রাণীরা
# আগস্টে শ্রীমঙ্গল থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়
# বনভূমি সংকুচিত হওয়ায় প্রাণীদের জীবনযাত্রা ব্যাহত
# বনের ভেতরের সড়ক ও রেলপথে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণীরা
# মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড বনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলছে
# নিজেদের স্বার্থে মানুষের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান

পরিস্থিতির এই ভয়াবহ রূপ ও গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান থেকে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, কেবল গত আগস্ট মাসেই শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন জনবহুল এলাকা থেকে অন্তত ২০টি বন্যপ্রাণী জীবিত ও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টিই ছিল বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে ৯টি অজগর, যার মধ্যে একটি মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া দুটি বেত আঁচড়া, দুটি শঙ্খিনী, একটি করে দাঁড়াশ, তক্ষক, বিরল প্রজাতির সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক, একটি শঙ্খচিল এবং দুটি বানর উদ্ধার করা হয়।

ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি বেত আঁচড়া। ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি মৃত অজগর উদ্ধার করা হয়।

এরপর ১২ আগস্ট শাহীবাগ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় একটি শঙ্খচিল। পরদিন ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ১৫ আগস্ট রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়। ১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়। ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় উদ্ধার করা হয় একটি উল্টোলেজি বানর।

এছাড়াও ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি শঙ্খিনী সাপ। পরদিন ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। এরপর ২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

এর বাইরে ১৫ আগস্ট নোয়াগাঁওয়ে স্থানীয়দের মাছ ধরার জালে একটি দাঁড়াশ সাপ আটকে পড়ে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা সাপটিকে না মেরে উল্টো বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে খবর দেন, যা বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে জনসচেতনতার এক দারুণ ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এদিকে বন্যপ্রাণীদের এভাবে ঘনঘন লোকালয়ে চলে আসার ঘটনাকে নিছক কোনো মৌসুমি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ পরিবেশকর্মী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তাদের মত, বনভূমি দ্রুত সংকুচিত হওয়া, প্রাকৃতিক আবাসস্থলে মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী হস্তক্ষেপ, খাদ্যের চরম ঘাটতি এবং বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের মতো বিষয়গুলো বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বনের ভেতরে খাবারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় এবং বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় জীবন বাঁচাতে তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ের দিকে ছুটে আসছে।

তবে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা ও অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। তাদের মতে, বর্ষা ও গরমের এই মৌসুমে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল কিছুটা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে লোকালয়ে তাদের উপস্থিতি বেশি দেখা যাওয়া অসম্ভব নয়। বন উজাড়ের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে বন বিভাগের দাবি, বর্তমানে বনের ভেতর বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বনের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া প্রধান সড়ক ও রেলপথের কারণে বন্যপ্রাণীর চলাচলে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে এবং অনেক সময় তারা দ্রুতগতির যানবাহনের নিচে পড়ে আহত বা নিহত হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তারা। পাশাপাশি, উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পরবর্তীতে উপযুক্ত ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বন বিভাগ।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল মনে করেন, বনের ভেতরে খাবারের তীব্র সংকট এবং মানুষের বেপরোয়া বসতি সম্প্রসারণই এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মূল কারণ। বন রক্ষায় বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি জানান, উদ্ধার করা প্রাণীগুলোকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা দিয়ে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়, কিন্তু বনের পরিবেশ উন্নত না হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে না।

পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বন্যপ্রাণী প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য অংশ এবং খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণের স্বার্থে মানুষের সকল ধরনের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং বনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, মানুষের এই অপরিকল্পিত ও ধ্বংসাত্মক জীবনযাত্রা আমাদের অমূল্য বন্যপ্রাণী সম্পদকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।

আরেক পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল একসময় ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু বনভূমি উজাড় হওয়া, মানুষের অনুপ্রবেশ, বসতি, রিসোর্ট ও কৃষিজমি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎস। ফলে খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ের দিকে আসছে বন্যপ্রাণী।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণেই বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। বন ও পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে একদিন এসব প্রাণী পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক জানান, উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

টিসিবির কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তর, সাশ্রয় হবে ৩০০-৩৫০ কোটি টাকা

দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে ভাসমান হাসপাতাল ‘স্বাস্থ্য তরী’ নির্মাণ করবে সরকার

চীনে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধার ঘোষণা

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য নাম ‘অর্নব’

‘সমন্বিত জলবায়ু পদক্ষেপ’ রক্ষা করতে পারে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ

২০২৬ সালের ১২ সিনেমায় ৭৫১ বার দেখানো হয় ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের দৃশ্য

রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি

চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে কুষ্টিয়ায় ফের বিএটিবি কর্মীদের মানববন্ধন

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে প্রযুক্তি ও জনবলে শক্তিশালী করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

হাওরে হাঁস চড়াতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু

টিসিবির কার্যক্রমে আসছে ডিজিটাল নজরদারি, বাদ ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী

আগামী মাসে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: রুশ রাষ্ট্রদূত