
বাংলাদেশ যখন ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে এই রোগের পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর সাম্প্রতিক তথ্য ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, ম্যালেরিয়া এখন আর কেবল পাহাড়ি অঞ্চলের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়, বরং এটি নতুন করে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
১. পরিসংখ্যানের সতর্কবার্তা: লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়া প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—এই তিন পার্বত্য জেলাতেই মোট আক্রান্তের প্রায় ৯৩ শতাংশের বেশি শনাক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় সংক্রমণের হার বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী, যা ২০৩০ সালের ‘জিরো ম্যালেরিয়া’ লক্ষ্যমাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
২. জলবায়ু পরিবর্তন: মশার নতুন রণক্ষেত্র
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এবারের ম্যালেরিয়া বিস্তারের পেছনে জলবায়ুর খামখেয়ালি আচরণ অন্যতম প্রধান কারণ।
অকাল বৃষ্টিপাত: মার্চ-এপ্রিল মাসে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এডিস মশার পাশাপাশি ম্যালেরিয়ার বাহক ‘অ্যানোফেলিস’ মশার বংশবিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে।
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা: ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা মশার জীবনচক্রকে সংক্ষিপ্ত করছে, ফলে তারা দ্রুত প্রজনন করতে পারছে।
৩. বিশেষজ্ঞদের গভীর পর্যবেক্ষণ: কেন এই নীরব বিস্তার?
সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি প্রধান কারণে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে:
ওষুধ ও কীটনাশক সহনশীলতা: ম্যালেরিয়ার পরজীবী অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা (Drug Resistance) গড়ে তুলছে। একইসাথে মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
লক্ষণহীন বাহক: পার্বত্য এলাকার অনেক মানুষের শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু থাকলেও সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এরা নিজেরা অসুস্থ বোধ না করলেও মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াচ্ছে।
সীমান্তবর্তী চ্যালেঞ্জ: প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সীমান্ত অঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত ম্যালেরিয়ার ‘ক্রস-বর্ডার’ সংক্রমণকে উসকে দিচ্ছে।
৪. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সতর্কতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের হার বাড়ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট। সংস্থাটি বলছে, কেবল মশারি ব্যবহার যথেষ্ট নয়; বরং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ (RDT) এবং কার্যকর চিকিৎসার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
৫. সমাধানের পথ: প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি সুপারিশ করেছেন:
১. তৃণমূল নজরদারি: পার্বত্য ও সীমান্ত এলাকায় ডোর-টু-ডোর স্ক্রিনিং বাড়ানো।
২. উন্নত গবেষণা: অ্যানোফেলিস মশার আচরণগত পরিবর্তন ও ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে গবেষণা করা।
৩. জনসচেতনতা: কেবল লিফলেট নয়, স্থানীয় ভাষায় কমিউনিটি ভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে মশারির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ম্যালেরিয়া নির্মূলে বাংলাদেশের বিগত এক দশকের অর্জন অনস্বীকার্য। তবে বর্তমানের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ প্রমাণ করে যে, আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। যদি এখনই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়, তবে এই ‘নীরব ঘাতক’ আবারও মহামারীর রূপ নিতে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে ম্যালেরিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে।