ঢাকামঙ্গলবার , ১১ অগাস্ট ২০২৬
  1. সর্বশেষ

পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর নদীই এশিয়ার খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরের চাবিকাঠি: এডিবি

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪১ বিকাল

Link Copied!

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর নদী সংরক্ষণ এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অস্থিতিশীল কৃষি পদ্ধতির কারণে এ অঞ্চলের জলসম্পদ মারাত্মক চাপে রয়েছে, যা খাদ্য ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

‘এশিয়ার খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরের চাবিকাঠি হলো পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর নদী’ শীর্ষক এক নিবন্ধে তিনি এসব কথা বলেন।

চিংফেং ঝাং বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যের ইতিহাস মূলত পানির ইতিহাস। সিন্ধু, গঙ্গা, মেকং ও হলুদ নদীর মতো নদীগুলো হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলের সভ্যতা, কৃষি ও বাণিজ্যের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। কিন্তু বর্তমানে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব নদী ও জলসম্পদ ক্রমবর্ধমান চাপে রয়েছে।

তিনি জানান, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাস করলেও বিশ্বের মোট মিঠা পানির মাত্র ২৮ শতাংশ এবং আবাদযোগ্য জমির ৩০ শতাংশ ব্যবহার করে ৪০০ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য উৎপাদন করা হয়। অথচ এ অঞ্চলের তিন-চতুর্থাংশের বেশি জমি জলসংকটের মুখে রয়েছে।

নিবন্ধে বলা হয়, এ অঞ্চলের প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনে সেচের জন্য মোট পানির প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ইতোমধ্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে।

চিংফেং ঝাং উল্লেখ করেন, গত ছয় দশকে এ অঞ্চল তিনটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। সবুজ বিপ্লব ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন দ্বিগুণ করেছে। গ্রামীণ শিল্পায়ন কৃষিকে প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে বিশ্বায়নের ফলে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।

তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি নতুন সংকটও তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভূগর্ভস্থ পানির সংকটাপন্ন কয়েকটি নদী অববাহিকা রয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সারের ব্যবহার চারগুণেরও বেশি বেড়েছে, যা নদী দূষণ, জলজ পরিবেশের ক্ষতি এবং উপকূলীয় মৃত অঞ্চল তৈরির কারণ হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসও পুষ্টিকর বৈচিত্র্যের পরিবর্তে শুধু ক্যালোরিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ, যেখান থেকে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ পানি পায়, দ্রুত গলে যাচ্ছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এ শতাব্দীর মধ্যেই এর এক-তৃতীয়াংশ হারিয়ে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত আরও অনিয়মিত হয়ে পড়ছে।

নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ ও ২০২৩ সালে পাকিস্তান, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ বন্যায় শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় খরার কারণে কৃষি উৎপাদন কমে গেছে।

চিংফেং ঝাং বলেন, কৃষি খাতও নদীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে নদীতে দূষণ বাড়ছে। পাহাড়ি ঢালে চাষাবাদের কারণে ভূমিক্ষয় হচ্ছে, যা জলাধারের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের হার প্রাকৃতিক পুনঃপূরণের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, “দূষিত নদী কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, আবার অস্থিতিশীল কৃষি নদীর অবক্ষয় ঘটায়।” এই চক্র ভাঙতে হলে নদী অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পানি ও কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

তার মতে, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করে নদীর পানির প্রবাহের পূর্বাভাস দিলে কৃষকরা সেচ ও ফসলের সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারবেন। উজানের বন পুনরুদ্ধার বন্যা ও পলির প্রবাহ কমাবে এবং জলাভূমি পুনরুদ্ধার ঝড়ের জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সহায়তা করবে।

চিংফেং ঝাং বলেন, পানিকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। কারণ বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে ঘটে। তাই প্রাকৃতিক মূলধন হিসাব, পানির যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং বাস্তুতন্ত্রের সেবা বিবেচনায় এনে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেন তিনি।

খাদ্য ব্যবস্থার টেকসই রূপান্তরের জন্য তিনি চারটি প্রধান সুপারিশ তুলে ধরেন।

প্রথমত, সর্বোচ্চ উৎপাদনের পরিবর্তে এমন কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা পানি সংরক্ষণ করবে, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করবে, ফসলের বৈচিত্র্য বাড়াবে এবং পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, ড্রিপ সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারে পানির ব্যবহার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক কৃষক পানি-নির্ভর ধান চাষের পরিবর্তে উদ্যান ফসল চাষ করে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও কমিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের নীতির মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। অনিরাপদ পানি ও দুর্বল স্যানিটেশন শিশুদের অপুষ্টি এবং খর্বাকৃতির অন্যতম কারণ। বর্তমানে বিশ্বের খর্বাকৃতির শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাস করে।

তৃতীয়ত, স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেচব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, নদী অববাহিকা পুনরুদ্ধার, ডিজিটাল পানি পর্যবেক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজনকে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুফল পাওয়া যাবে। মেকং ও দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বিত নদী অববাহিকা কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

চতুর্থত, পানি ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি শ্রমশক্তির বড় অংশ নারী হলেও পানি ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা সীমিত। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা সেচ ব্যবস্থাপনায় অংশ নিলে রক্ষণাবেক্ষণ উন্নত হয় এবং সেচসেবা আরও কার্যকর হয়।

চিংফেং ঝাং বলেন, পুষ্টির উন্নতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির কোনো বিকল্প নেই। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নদীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই নদীকে অর্থনৈতিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করাই টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি হবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

পুলিশকে জরিমানা করার ক্ষমতা দিলে গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধ হবে

আমিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের ভিসা পুনর্বহালের দাবি

Realme C100X with new battery backup surprises

ব্যাটারি ব্যাকআপে নতুন চমক নিয়ে রিয়েলমি সি১০০এক্স

লঘুচাপের প্রভাবে টানা কয়েক দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস

এইচ৫ বার্ড ফ্লু: ঝুঁকিপূর্ণ পাখিকে টিকা দেবে অস্ট্রেলিয়া

রাঙ্গামাটির ৩৮৯ বিদ্যুৎবিহীন বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা

শাহরাস্তিতে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৩

যেভাবে বুঝবেন আপনার হাড় দুর্বল হচ্ছে কি না

চীনে শক্তিশালী টাইফুন ডলফিন, ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের সতর্কতা

কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ১১১

এক আগুন নিভতেই আরেক আগুন, ভয়াবহ দাবানলে যুক্তরাষ্ট্র