
নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পরও নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। প্রবল পানির স্রোত, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ঢলে বেশ কয়েকটি গ্রাম তলিয়ে গেছে। দুই দেশের সর্বশেষ হিসাবে, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত ৬৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প থাকা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিখোঁজের তালিকায় নতুন করে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর নাম যুক্ত করা হয়েছে। এর আগে তালিকায় ট্রেকার ও তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ব্যক্তিদের নামও ছিল।
দুর্যোগ থেকে বেঁচে ফেরা মানুষজন জানিয়েছেন, বন্যায় তারা প্রায় সবকিছু হারিয়েছেন। নিখোঁজ স্বজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই উৎকণ্ঠার পাশাপাশি তাদের এখন শূন্য থেকে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া বুদ্ধি রাম দাঙ্গোল এএফপিকে বলেন, নদীর কাছের সব বসতি ভেসে গেছে। সেখানে এখন আর কিছুই নেই।
সামঝানা থিং জানান, নিখোঁজ ভাইয়ের কোনো খবর পাওয়ার আশায় তিনি তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছেন। তিনি আশা করছেন, তার ভাই হয়তো নিরাপদ কোনো জায়গায় রয়েছেন।
রেড ক্রস জানিয়েছে, বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। দুর্যোগে মানুষের ওপর ব্যাপক মানসিক ও শারীরিক আঘাত নেমে এসেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জীবিতদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করছে। তবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক এলাকায় খাবার ও পানির সরবরাহ কমে আসছে।
এদিকে নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চলার মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতে বিভিন্ন স্থানে বরফ ও কাদা জমে বিশাল জলাধারের মতো পানি আটকে আছে। এর মধ্যে একটি জলাধার উদ্ধারকর্মীদের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের পুলিশ সব উদ্ধারকর্মীকে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তিব্বত প্রান্তে আবারও একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তারা।
নতুন বন্যার আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বতের গিরং এলাকায় চীনের উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতির ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া শনিবার ভোরে জানিয়েছে, ওই এলাকায় দুই গ্রামবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল সীমান্তের দিকে ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে কয়েকজন মানুষ আটকা পড়েছেন বলে শনাক্ত করেছে নেপালি সেনাবাহিনী। তাদের উদ্ধারে সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানান, আটকে পড়াদের উদ্ধারে দুটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। তবে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় উদ্ধারকাজ জটিল হয়ে পড়েছে। ওই এলাকা থেকে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে শতাধিক মানুষকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ত্রিশূলী উপত্যকার বিভিন্ন বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা জানান, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বুদ্ধ তামাং নামের এক শ্রমিক জানান, বন্যার সময় তিনি একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে থাকার পর বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টারে করে তাকে উদ্ধার করা হয়।
এদিকে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের শুক্রবারের হিসাবে, দেশটিতে বন্যা ও ভূমিধসে ৫৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ হাজার ৯২৪ জনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব মরদেহ বন্যায় ভেসে যাওয়া ব্যক্তিদের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৈলাস তীর্থযাত্রায়ও বিপর্যয়
নেপাল-চীন সীমান্তে নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বহু হিন্দু তীর্থযাত্রী রয়েছেন। তাদের অনেকেই তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন।
৪৬ বছর বয়সী শিবরঞ্জনী মুথুনাথান ৫৬ জনের সঙ্গে একটি বাসে করে চীনের সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তারা যানজটে আটকা পড়েছেন বলে মনে করেছিলেন। পরে হঠাৎ কুয়াশা ও ধোঁয়ার মতো কিছু তাদের ঘিরে ফেলে এবং প্রবল পানির স্রোত ধেয়ে আসে।
মুথুনাথান জানান, পানির স্রোতে আশপাশের গাড়িগুলো ভেসে যাচ্ছিল এবং কাদার নিচে চাপা পড়ছিল। পরে তারা একে একে বাস থেকে বের হয়ে পাহাড়ের ওপর উঠে প্রাণে বাঁচেন।