ঢাকাসোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

নিষিদ্ধ বিষ ব্যবহারে জনস্বাস্থ্যে অশনিসংকেত

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৯:৩১ বিকাল

Link Copied!

কৃষক ফসলের বালাইনাশক বা কীটনাশক-কে ওষুধ বলে। মূলত এসব ওষুধ না বিষ! এমনকি কীটনাশকও শুধু নয়, এটা বিষ! কীটপঙ্গ হত্যার সাথে মানুষসহ যেকোন প্রাণী মেরে-ফেলতে পারে। বর্তমানে ফসল চাষাবাদের কথা ভাবলেই প্রথমে মাথায় আসে বস্তা বস্তা সার, গাদাগাদা বিষ। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া ফসল উৎপাদন হবেই না- এ কথাটি আমাদের সকলের মাথায় গেঁথে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে কীটনাশক ও রাসায়ণিক সার এর ব্যবহার গত শতকে ষাটের দশকেও ছিল না। প্রথম ১৯৫৬ সালে সরকার ৩ মে টন কীটনাশক আমদানি করে। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সরকার বিনামূল্যে কৃষকদের মধ্যে ১০০% ভর্তুকিসহ কীটনাশক বিতরণ করত। ১৯৭৪ সালে এ ভর্তুকি ৫০% কমিয়ে এবং ১৯৭৯ সালে ভর্তুকি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে কীটনাশক ব্যবসা বেসরকারি খাতে হস্তানতরিত হয়।

এইসব জীবননাশক ভারীধাতুর রাসায়নিক যৌগকে ঔষধ বা কীটনাশক বলতে আমাদের অভ্যস্ত করা হলো। এ বিষ শুধু ফসলের ক্ষতিকর পোকাদেরই মারে না। উপকারী পতঙ্গ, মাছ, ব্যাঙ, শামুক-ঝিনুক, সাপ এমকি প্রাকৃতিক লাঙল নামে খ্যাত কেঁচো সমূলে মেরে ফেলে। মাত্র দু-তিন দশকে কৃষিতে বিষের ব্যবহারে অগণিত জীবকে বিলুপ্ত করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত অন্তত ১৭টি কীটনাশক উপাদান বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত বছর ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে ‘দ্যা ডেইলি স্টার’ ইংরেজী দৈনিকে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এসব কীটনাশক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই রাসায়নিকগুলোকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এসব কীটনাশক স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

উল্লিখিত গবেষণায় সাত সদস্যদলের নেতৃত্ব দেন কীটতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অধ্যাপক গোপাল দাস। এই গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এমন ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টির উপস্থিতি ও ব্যবহারের কথা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন। গবেষণা অনুযায়ী- দেশে বহুল ব্যবহৃত ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক হলো- প্যারাকোয়াট, গ্লাইফোসেট, ক্লোরপাইরিফস, অ্যাবামেকটিন, অ্যাসিটোক্লোর, জিঙ্ক ফসফাইড, ব্রোমাডিওলোন, কার্বেনডাজিম এবং প্রোপিকোনাজোল। বাকি সাতটি স্বল্প ব্যবহৃত- ক্যাডুসাফস, থিয়াক্লোপ্রিড, স্পিরোডিক্লোফেন, ডাইমেথোমর্ফ, বিটা-সাইফ্লুথ্রিন, সাইপ্রোকোনাজোল এবং এডিফেনফস। বিপজ্জনক কীটনাশকগুলোর মধ্যে প্যারাকোয়াট বাংলাদেশে কৃষকরা অহরহ ব্যবহার করেন, যদিও এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রসহ ৪০টিরও বেশি দেশে নিষিদ্ধ।

উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- বর্তমানে উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ে ৮ হাজারের বেশি কীটনাশক পণ্য নিবন্ধিত রয়েছে। বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়শনের (বিসিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ও উৎপাদনকারী ও দুটিই বাড়ছে। ২০২৪ সালে কৃষকেরা ৪০ হাজার ৮৩২ টন কীটনাশক ব্যবহার করেছেন, যা আগের বছরে ছিল ৩৮ হাজার ৬৪৮ টন। ২০১০ সালে কীটনাশক কোম্পানির সংখ্যা ছিল ১২৪, যা এখন বেড়ে ৯০০তে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণত দেখা যায় ইউরোপ বা আমেরিকার নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া কৃষির বিষ ভারতে নিষিদ্ধ হতে আরো বেশ কিছু সময় লাগে। ভারতের পর আমাদের আরও সময় লাগে। ভারতে নিষিদ্ধ হলেও চোরাইপথে বাংলাদেশে এসে তা অবাধে ব্যবহার হয়। ২৩ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে দৈনিক যুগান্তরে ‘‘মেহেরপুরে নিষিদ্ধ কীটনাশকে সয়লাব : হুমকিতে জনস্বাস্থ্য” শিরোনামে সংবাদে জানা যায়-ভারত থেকে অবৈধ পথে বছরে অন্তত কয়েক কোটি টাকার কীটনাশক আসছে। দেড় দশকেরও বেশি আগে নিষিদ্ধ কীটনাশকের মধ্যে আছে ডিডিটি (ডাইক্লোরো-ডাইফেনাইল-ট্রাইক্লোরোইথেন), অলড্রিন, ক্লোডেন ও হেপ্টাক্লোর।

জয়পুরহাট ছোট্ট জেলা শহরের- সন্নিকটে বিসিক জেলা কার্যালয় ওয়েবসাইটের তালিকাতেই দেখলাম ২৯ টি কীটনাশক কোম্পানি নিবন্ধিত রয়েছে। শিল্পনগরীতে এসব কীটনাশক কোম্পানি বড় বড় ড্রামে, কন্টেনিয়ারে বিষের উপাদান আমদানী করে প্যাকেটজাত বা বোতলজাত করে তা বাজারজাত করছে বিভিন্ন কীটনাশকরে দোকান বা সরাসরি কৃষকের মাঝে। দেখেছি- কীটনাশক কোম্পানি রিপ্যাকেজিং পরিবেশ যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ ও ভয়াবহ। নেই কোন উল্লেখ করার মতো যন্ত্রপাতি, সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং হাতে হাতে রিপ্যাকেজিং করে। অপরদিকে কি প্রকার বিষের রাসায়নিক উপাদান কিভাবে, কি পারিমানে নির্ধারণ হচ্ছে? নিষিদ্ধ উপাদন মিশ্রিত হচ্ছে কিনা? বাতিলকৃত বা নষ্ট বিষাক্ত উপাদান কোথায় কিভাবে ফেলছে? এর নজরদারী, তদারকীতে- পরিবেশ অধিদপ্তর বা কৃষি সম্প্রসারণএর উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং যথাযথাভাবে করতে করতে পারে কি? তাদেরই স্থানীয় পর্যায়ে সে মানের পরীক্ষাগার বা জনবলের সক্ষমতা আছে কি? নাই যদি থাকে- তাহলে এত এত কীটনাশক কোম্পানির অনুমোদন দিয়ে জন-জীবন প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংস করা অর্থ কি।

কার্ল মার্কস বলেছিলেন ‘ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার মূল কথা হলো প্রকৃতির উপর মানুষের আধিপত্য’। পুঁজিবাদী বহুজাতিক কোম্পানি এসব কৃষি বিষের মাধ্যমে একদিকে পুঁজি আহরণ অপরদিকে এই জীবনঘাতী রোগে ঔষধ আবিস্কার-চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে চলছে অবিরতভাবে শোষণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সার ও কীটনাশকের রমরমা শুরু হয়। যুদ্ধের বিস্ফোরক সরবরাহ করা বিএসএফ, মনসান্তো, বায়ার কোম্পানি সার ও কীটনাশকের বাজার দখল করল। অথচ কীটনাশক মানুষ বা পরিবেশের গুরুতর বা স্থায়ী ক্ষতি করছে। প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়া, থাইরয়েডে রোগ বৃদ্ধি, ডায়েবেটিক, কিডনী রোগ, ক্যানসার, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, পরিপাতন্ত্রের রোগ, স্লায়ু রোগসহ বিভিন্ন রোগের জন্য কীটনাশক দায়ী। ফসলে বিষ প্রয়োগের সময়ও অনেক কৃষকের গুরুতর অসুস্থ্য হয়, এমনকি মৃত্যুও ঘটে। গত সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের গ্রামের কৃষক চঞ্চল সরকার আমন ধানের জমিতে ক্যারেন্ট পোকা বা বাদামী ঘাস ফড়িং দমনে এক প্রকার বিষ স্প্রে করায় চোখ-মুখ প্রচণ্ড জালা করে এবং ঠোট পুড়ে যায়। যা সাড়াতে চিকিৎসায় ওষুধ সেবন করে কয়েকদিন লেগে যায়।

বিবিসি বাংলায় ০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়- জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির হাসপাতালে যত রোগী ভর্তি হয়েছেন তাদের উপরে একটি জরিপ করেছে। প্রকাশিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সংস্থাটির হাসপাতালে যত পুরুষ রোগী ভর্তি হয়েছেন – তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই নানা ভাবে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। প্রধান কারন হিসাবে- জমিতে যে কীটনাশক তারা দেয় এবং সেটির নিয়মিত সংস্পর্শে আসা মর্মে উল্লেখ করা হয়।

কৃষি বিষের ভয়াবহ ক্ষতির কথা কোন প্রচার প্রচারণা করা হয় না। কিন্তু এর বিপরীতে কৃষি বিষ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভবই নয় এই ধারণা মানুষের মস্তিষ্কের বদ্ধমূলে ঢুকে দেয়া হয়েছে। আরও ভয়াবহ বিষয়- কৃষক তার ফসলে দীর্ঘদিন যাবত বিষ প্রয়োগের ফলে কীটপতঙ্গ একসময় সহনশীলতা অর্জন করে। কীটপতঙ্গ দমন না হওয়াই দেখেছি- চাষীরা এতে এক বিষের সাথে একাধিক বিষের সংমিশ্রণে ফসলে স্প্রে করে। কাজ কম হলে বারে ও পরিমানে মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

একদিকে ইউরোপ বা আমেরিকা সহ সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ অনেক বিষ আমাদের দেশে সরকার অনুমোদন দিচ্ছে, অন্যদিকে চোরাচালানে এনে দেশে নিষিদ্ধ বিষও ব্যবহার হয়। আবার দেশে প্রায় হাজারখানেক বিষের কোম্পানির হাজার হাজার প্রকারের বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে সারাদেশে। তাই অযাচিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন্দ্র থেকে কোম্পানি ও বিষ অনুমোদন না দেয়া এবং কৃষি, পরিবেশ, শিল্প সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্থানীয়ভাবে তদারকীর কার্যকর ব্যবস্থা ও সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। অপরদিকে কৃষি বিষ ব্যবহারে দ্রুততার সাথে সীমিতকরণ এবং আইপিএম, আইসিএমসহ জৈব কৃষি আনয়নে, সম্প্রসারণে জনসচেনতা বৃদ্ধি করাতে হবে। নইলে আমাদের বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগে মহামারির শিকার হতে হবে অদূর ভবিষ্যতে।

রতন মণ্ডল
(কৃষিবিদ, কলাম লেখক ও ‘দেশীগাছ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আন্দোলন’ এর উদ্যোক্তা)

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ময়মনসিংহে ট্রাকচাপায় অন্তঃসত্ত্বা নারী নিহত

খুলনা-ঢাকা মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় সাংবাদিক নিহত

আগামী পাঁচ দিনজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস

ইন্দোনেশিয়ায় ২৪৩ যাত্রী-ক্রু বহনকারী ফেরির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

উদ্বোধনী দিনে কৃষক কার্ডের প্রণোদনা পাবেন ১ লাখ ১০ হাজার কৃষক

রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের আশা

সকল জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা চালু করবে সরকার

ডিএনসিসির ৫৪ ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান

কর্ণফুলীতে কাভার্ডভ্যান-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে নারীসহ নিহত ৪

দৌলতপুরে পদ্মার পানি বাড়ছে, পানিবন্দী ৬০ হাজার মানুষ

যেসব ভুল স্বাস্থ্য ধারণা উপকারের বদলে ক্ষতি করছে

ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প