
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের সবচেয়ে ‘দুর্বল’ ও নিম্ন সক্ষমতার শহরের তালিকায় শীর্ষ সারিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের দুই প্রধান নগরী ঢাকা ও চট্টগ্রাম। ভৌগোলিক-স্থানিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আলফা-জিও’ -এর এক বৈশ্বিক মূল্যায়নের তথ্য উল্লেখ করে মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু বিপর্যয় ও দুর্যোগ মোকাবিলার সর্বনিম্ন সক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের ৭২টি প্রধান নগরীর মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা চতুর্থ এবং দেশের প্রধান বাণিজ্য ও বন্দরনগরী চট্টগ্রাম নবম স্থানে অবস্থান করছে। প্রতিবেদনটি বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের বিপরীতে বাংলাদেশের মতো অতি-ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনার মারাত্মক ফাঁকফোকর উন্মোচন করেছে।
মূল্যায়নের ভিত্তি ও সূচক :
আন্তর্জাতিক এআই ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলফা-জিও বিশ্বজুড়ে নির্বাচিত ৭২টি মেগাসিটি ও বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ শহরের ওপর তাদের জলবায়ু ঝুঁকি ও অভিযোজন সূচক (ক্লাইমেট রিস্ক অ্যান্ড অ্যাডাপটেশন ইনডেক্স) পরিচালনা করে। অনুসন্ধানে প্রধানত দুটি দিক বিবেচনা করা হয়েছে—প্রথমত, শহরগুলোর সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ বন্যা, অতিবৃষ্টি, চরম তাপপ্রবাহ, খরা, তীব্র সামুদ্রিক ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি। দ্বিতীয়ত, এসব দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে তা সামলে ওঠার সক্ষমতা বা নগরগুলোর ‘অভিযোজন ক্ষমতা’।
অভিযোজন ক্ষমতা পরিমাপের ক্ষেত্রে নগরগুলোর বিদ্যমান অবকাঠামোগত স্থায়িত্ব, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, তাৎক্ষণিক ও সুনির্দিষ্ট আগাম সতর্কবার্তা প্রদান প্রযুক্তি, সার্বিক প্রশাসনিক প্রস্তুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি এবং নীতিগত বাস্তবায়নের হার গভীরভাবে যাচাই করা হয়েছে। এই সামগ্রিক সূচকেই সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা গেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের চরম ঝুঁকির মূল কারণ :
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম—দুই শহরই ভৌগোলিক কারণেই উচ্চমাত্রার প্রাকৃতিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকা মূলত চারদিক থেকে নদ-নদী দ্বারা বেষ্টিত এবং দেশের মধ্যভাগে অবস্থিত হওয়ায় বন্যার ঝুঁকির মধ্যে শীর্ষ তালিকায় অবস্থান করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত অতি-ঘনবসতি, জলাশয় ও নদী ভরাট করে অপরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ এবং অকার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে সামান্য বৃষ্টিপাত বা নদী উপচে পানি এলেই রাজধানীর বিশাল এলাকা দীর্ঘ মেয়াদে জলজটে স্থবির হয়ে পড়ে। অপরদিকে, নগরীর ওপর তৈরি হওয়া ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবের কারণে গ্রীষ্মকালে ঢাকার তাপমাত্রা অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্র চট্টগ্রাম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির শিকার। তাছাড়া পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিবৃষ্টিজনিত ভয়াবহ পাহাড় ধস ও নগর প্লাবন চট্টগ্রামের জন্য এক নিত্যনৈমিত্তিক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ড্রেনেজ-খালের অবৈধ দখল এবং সাগর ও নদীতে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ায় সামান্য জোয়ার বা বৃষ্টিতেই বাণিজ্যিক এই নগরীর বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়।
রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের হার যেমন বাড়ছে, তার বিপরীতে এই দুই প্রধান নগরীর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি অত্যন্ত সীমিত। আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার সংকট এবং নীতিগত পরিকল্পনার ধীরগতির কারণে প্রতিটি দুর্যোগের পরই ঢাকা ও চট্টগ্রামকে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি ও দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার মুখে পড়তে হয়।
উন্নয়নশীল বনাম উন্নত বিশ্বের নগর চিত্র :
আলফা-জিও-র মূল্যায়নে দেখা যায়, কেবল কম উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলোই নয়, বরং নিউ ইয়র্ক, লন্ডন বা টোকিওর মতো উন্নত বৈশ্বিক শহরগুলোও চরম জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তবে উন্নত শহরগুলোর সুনির্দিষ্ট কৌশলগত নীতি, আধুনিক অবকাঠামো এবং অর্থায়নের পর্যাপ্ততা থাকায় তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।
এর বিপরীতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অবস্থান একেবারেই বিপরীত মেরুতে। এখানে ঝুঁকি যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিযোজন সক্ষমতা বা প্রতিরোধমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় সরাসরি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং সার্বিক জীবনযাত্রাকে থমকে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের তাগিদ ও করণীয় :
পরিবেশ ও নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীসহ অভ্যন্তরীণ খালগুলোকে দখলমুক্ত করে একটি সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নগরীতে সবুজ এলাকা ও জলাশয় রক্ষা করা জরুরি। অপরদিকে, চট্টগ্রামের জন্য পাহাড় নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা, উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং সাগরের পানি প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর সুইচগেট ও ড্রেনেজ পাম্প স্থাপন করা অত্যন্ত আবশ্যক।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জলবায়ু তহবিলের অর্থ সঠিক ও স্বচ্ছ উপায়ে নগরগুলোর অভিযোজনমূলক প্রকল্পে ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নের দাবিদার হলেও নিজস্ব নগর পরিকল্পনায় যদি পরিবেশবান্ধব নীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো না যায়, তবে ভবিষ্যতে এই দুই মেগাসিটি মারাত্মক বাসযোগ্যতা সংকটে পড়বে।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (বিসিএএস) নির্বাহী পরিচালক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবিলায় শুধু আন্তর্জাতিক তহবিলের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সচল করা, প্রাকৃতিক জলাধার ও নালা দখলমুক্ত করা এবং তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থার আধুনিক প্রযুক্তি চালু করা এখন সময়ের দাবি। দ্রুত এসব পদক্ষেপ না নিলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।