
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একসময় প্রাণবন্ত একটি সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চিত্র সরাসরি দেখতে মঙ্গলবার প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র টুভালুতে সফর করেছেন এক ডজনের বেশি বিশ্বনেতা।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ‘প্রাক-কপ’ বৈঠকের ফাঁকে এই সফরের আয়োজন করা হয়। ফিজির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি শিকার দেশগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
আগামী মাসে তুরস্কে জাতিসংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৃহৎ বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এর প্রস্তুতি হিসেবেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশ্বের যেসব অঞ্চল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল তার অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় মানুষের বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে প্রবালপ্রাচীর ব্যাপকভাবে সাদা হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে টুভালু
টুভালু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ৬০০। সমুদ্রের পানি দেশটিকে গ্রাস করলে জনগণকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও ইতোমধ্যে করছে দেশটি।
তবে সফরকারী নেতাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন এই দ্বীপরাষ্ট্রে যান। তাদের বেশিরভাগই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নেতা।
তাদের মধ্যে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। এ বছর জলবায়ু আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। তবে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় কয়লা রপ্তানিকারক হওয়ায় জলবায়ু নীতিতে দ্বিমুখী অবস্থানের অভিযোগও রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে।
ভারী বৃষ্টির মধ্যেও ঐতিহ্যবাহী পোশাক, ফুলের মুকুট ও বৃষ্টি থেকে রক্ষার ছাতা নিয়ে শত শত মানুষ নেতাদের স্বাগত জানান। এএফপির একটি ছোট প্রতিনিধি দলও তাদের সঙ্গে সফরে ছিল।
এরপর নেতারা টুভালু কোস্টাল অ্যাডাপটেশন প্রজেক্ট পরিদর্শন করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ক্ষতি কমাতে ভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্পটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
নেতারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একটি ঐতিহ্যবাহী সংলাপেও অংশ নেন।
আলবানিজকে নিয়ে সমালোচনা
প্রাক-কপ বৈঠকে অস্ট্রেলিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। করদাতাদের অর্থে এই আয়োজনের ব্যয় নিয়ে নিজ দেশে সমালোচনা হলেও অস্ট্রেলিয়া এটিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আয়োজন হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে মঙ্গলবার টুভালু সরকারের এক উপদেষ্টা আলবানিজের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, একটি অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী মাথার পোশাক না পরায় এবং সফর পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করায় অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী টুভালুর প্রতি অসম্মান দেখিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই উপদেষ্টা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি বলেই তারা আমাদের দেশ ও সার্বভৌমত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না। আমাদের কাছে বিষয়টি কিন্তু এমনই মনে হচ্ছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব
টুভালু বিশ্বের সবচেয়ে কম ভ্রমণ করা দেশগুলোর একটি। দেশটির রাজধানী ফুনাফুটির সর্বোচ্চ স্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই মিটার বা ৬ দশমিক ৬ ফুট উঁচু।
সমুদ্রের পানি বাড়ার কারণে টুভালুর নয়টি প্রবাল দ্বীপের মধ্যে দুটি ইতোমধ্যে অনেকটাই পানিতে তলিয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই দ্বীপপুঞ্জের পুরো অঞ্চলই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।
২০২৪ সালে একটি সামুদ্রিক তাপপ্রবাহে টুভালুর দ্বীপগুলো গড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রায় ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবাল ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।