
মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় বা আড্ডায় একে অপরের বলার ভঙ্গি, কথার সুর (উচ্চারণ) নিজেদের অজান্তেই কিছুটা মিলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা এবার দেখতে পেয়েছেন যে, আফ্রিকান সাভানা হাতিরাও দলবদ্ধভাবে কোরাস বা সমবেত ধ্বনিতে ডাক দেওয়ার সময় ঠিক একই রকম আচরণ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে চালানো এক নতুন গবেষণায় এই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ক্রিস্টা লেস্টে-ল্যাসেরের লেখা এবং বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
হাতিরা মূলত বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ভাষা এবং এক বিশাল পরিসরের শব্দের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ মাধ্যম হলো তাদের গভীর ও নিচু ফ্রিকোয়েন্সির ‘রাম্বল’ বা গুঞ্জন ধ্বনি, যা মানুষের কান সাধারণত ধরতে পারে না। তবে এই শক্তিশালী গভীর আওয়াজ ১০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং এর মাধ্যমে তারা নিজেদের পরিচয় ও পরিস্থিতির বার্তা দূরদূরান্তে পাঠায়।
গবেষণার জন্য কেনিয়ার আম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্কের বন্য আফ্রিকান হাতিদের ওপর দীর্ঘ চার দশক ধরে সংগৃহীত ৯০২টি রম্বল ধ্বনির রেকর্ডিং ব্যবহার করা হয়। ‘আর্থ স্পেসিস প্রজেক্ট’-এর গবেষক সারা কিন এবং ‘এলিপেন্ট ভয়েসেস’-এর জয়েস পুলসহ অন্যান্য গবেষক দল আধুনিক মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এই জটিল ‘ককটেল পার্টি প্রবলেম’ (একসাথে অনেক হাতির আওয়াজের মধ্যে পৃথক করা) সমাধান করেন। গবেষকরা হাতিদের এই শব্দগুলোকে মূলত ছয়টি সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভাগ করে বিশ্লেষণ করেন।
মেশিন লার্নিং বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, হাতিরা যখন দলবদ্ধভাবে কোরাস তৈরি করে, তখন কোরাস এগোতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে তাদের গলার সুর বা আওয়াজের আকৃতি একে অপরের সঙ্গে মিলতে শুরু করে। অর্থাৎ, তারা নিজেদের কণ্ঠস্বরকে পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে হাতিরা কেবল সাধারণ ডাকই নয়, বরং তাদের গভীর গুঞ্জন বা রম্বল ধ্বনিতেও একে অপরকে অনুকরণ করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।
গবেষকদের মতে, এই ধরনের সুরের মিল বা অনুকরণ মূলত বিশেষ কিছু সামাজিক পরিস্থিতিতে বেশি ঘটে থাকে। যেমন—হাতিরা যখন আলাদা থাকার পর একে অপরকে অভিবাদন জানায়, দূরে থাকা অবস্থায় নিজেদের অবস্থান ও যোগাযোগ রক্ষা করে, অথবা পরবর্তীতে কী করা উচিত বা কোন দিকে যাওয়া দরকার তা নিয়ে দলগত পরিকল্পনা বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কথোপকথনের সঙ্গে এই আচরণের চমৎকার মিল রয়েছে। এটি হাতিদের অত্যন্ত উন্নত প্রজ্ঞা, সামাজিক বন্ধন এবং জটিল সমাজ ব্যবস্থার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে হাতিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করে এবং দলগত সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া, এই গবেষণার ফলাফল বন্য হাতিদের আচরণ ও গতিবিধি দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করবে, যা ভবিষ্যতে তাদের সংরক্ষণ কার্যক্রমেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।