ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ

কৃষিতে নতুন বিপ্লব, লবণাক্ততা ও খরা রোধে নতুন আশা ‘ম্যাজিক সয়েল’

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৫ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৯ সকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যে খাতটি সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে, তা হলো কৃষি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততার প্রকোপ এবং দীর্ঘমেয়াদী খরা ফসলের উৎপাদনকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে, যেখানে দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল এলাকা লবণাক্ততায় আক্রান্ত এবং উত্তরের কৃষকরা খরার সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন, সেখানে চিরাচরিত কৃষিপদ্ধতি এখন আর যথেষ্ট নয়। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে কৃষি বিজ্ঞানের এক অভাবনীয় উদ্ভাবন—‘ম্যাজিক সয়েল’ বা ‘ন্যানো-কোটিং’ প্রযুক্তি—কৃষকদের সামনে এক নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে। কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ছাড়াই গাছকে বিরূপ পরিবেশে টিকে থাকার শক্তি জোগানো এই ন্যানো-প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে।

‘ম্যাজিক সয়েল’ কী?:
সহজ কথায়, ন্যানো-পার্টিকেলস হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা, যা খালি চোখে দেখা অসম্ভব। বিজ্ঞানের পরিভাষায়, এক ন্যানোমিটার হলো এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগ। যখন এই ন্যানো-কণাগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বীজের ওপর বা চারাগাছের গোড়ায় একটি পাতলা আবরণ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে বলা হচ্ছে ‘ম্যাজিক সয়েল’ বা ‘ন্যানো-কোটিং’ প্রযুক্তি। এই আবরণটি কোনো সাধারণ আস্তরণ নয়; এটি উদ্ভিদের জন্য একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এটি মাটির অণুজীবের সাথে গাছের মিথস্ক্রিয়াকে এমনভাবে বদলে দেয় যে, প্রতিকূল পরিবেশেও উদ্ভিদ তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলন অব্যাহত রাখতে পারে।

‘ম্যাজিক সয়েল’ প্রযুক্তি কোনো একক ব্যক্তির আবিষ্কার নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে কৃষি ও ন্যানো-প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণার ফসল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুর্দু বিশ্ববিদ্যালয়, কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি এবং চীন ও থাইল্যান্ডের স্বনামধন্য কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে এই প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে। ড. কার্ট রিস্ট্রফ, ড. গ্রেগ লাউরি এবং তাদের নেতৃত্বাধীন গবেষণা দলগুলো ল্যাবরেটরি পর্যায়ে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন।

এই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ‘ন্যানো-বায়োটেকনোলজি’। বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে বীজের ওপর চিটোসান বা কার্বন ডটস-এর মতো জৈব উপাদানের অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি আবরণ তৈরি করেছেন। এই আবরণ তৈরির পদ্ধতিকে বলা হয় ‘আয়নোট্রপিক জেলিয়েশন’ বা ‘ফোলিয়ার স্প্রে’। এই প্রক্রিয়ায় ন্যানো-পার্টিকেলসগুলোকে নির্দিষ্ট আকৃতি ও গুণাগুণ দেওয়া হয়, যা গাছের কোষের ভেতরে প্রবেশ করে লবণের বিষক্রিয়া থেকে গাছকে রক্ষা করে এবং খরার সময়ে গাছের জলীয় বাষ্প ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

সাধারণত, অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটিতে গাছের মূল দিয়ে পানি শোষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, ফলে গাছ শুকিয়ে মারা যায়। ন্যানো-কোটিং প্রযুক্তি এই সমস্যার মূলেই আঘাত করে। এই ন্যানো-কণাগুলো গাছের কোষের ভেতরে লবণ প্রবেশ করতে বাধা দেয় এবং গাছের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে, খরাপ্রবণ এলাকায় মাটির আর্দ্রতা যখন কমে যায়, তখন এই ন্যানো-পার্টিকেলসগুলো গাছের অভ্যন্তরীণ বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে গাছ তার বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পানি ও পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে। ফলে, সামান্য বৃষ্টিপাত বা খরাতেও গাছ তার সজীবতা হারায় না।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই প্রযুক্তিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। ন্যানো-কণাগুলো মাটির গভীরে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলোকে ভেঙে গাছের শিকড়ের গ্রহণের উপযোগী করে তোলে। ফলে কৃষকরা কম খরচেই অধিক ফলন নিশ্চিত করতে পারেন।

বাংলাদেশের কৃষিতে এর প্রয়োজনীয়তা:

বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় লোনা পানি চাষাবাদের জমি গ্রাস করছে। ফলে হাজার হাজার একর জমি অনাবাদি পড়ে থাকছে। অন্যদিকে, উত্তরের জেলাগুলোতে খরার প্রকোপে আমন ও আউশ ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

লবণাক্ততা মোকাবিলা: দক্ষিণবঙ্গের কৃষকরা এখন আর লোনা পানির কারণে আগের মতো ধান বা অন্যান্য ফসল ফলাতে পারছেন না। ন্যানো-কোটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করলে লবণাক্ত মাটিতেও উচ্চফলনশীল জাতের ফসল চাষ করা সম্ভব হবে।
খরাসহিষ্ণুতা: উত্তরাঞ্চলের শুষ্ক ও খরাপ্রবণ মাটিতে ন্যানো-পার্টিকেলস ব্যবহারের মাধ্যমে চাষাবাদ করলে পানির সেচ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।

খাদ্য নিরাপত্তা: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে হলে কম জমিতে বেশি ফসল ফলানোর বিকল্প নেই। এই প্রযুক্তি ফসলকে দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখবে।

রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। ‘ম্যাজিক সয়েল’ প্রযুক্তির অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এটি মাটির অণুজীবের ক্ষতি করে না, বরং মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীলতা কমায়, এটি পরিবেশের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করে। টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ার জন্য এটি একটি স্মার্ট ও আধুনিক সমাধান।

বর্তমানে এই প্রযুক্তি ল্যাবরেটরির গণ্ডি পেরিয়ে মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশেও কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটগুলো (বারি) এই প্রযুক্তির বিভিন্ন উপাদানের ওপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা চালাচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরিভাবে সাধারণ কৃষকের হাতের নাগালে পৌঁছায়নি। বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত বিনিয়োগ এবং কার্যকর প্রযুক্তি স্থানান্তর। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হলো, এই ন্যানো-পার্টিকেলসগুলোর উৎপাদন খরচ কমিয়ে যেন প্রান্তিক কৃষকরাও এটি সহজে ব্যবহার করতে পারেন।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Front-of-Package Labelling to Warn About Ultra-Processed Food Risks

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করবে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং

কানাডার সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

লঘুচাপের প্রভাবে সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি, এরপর আরও বাড়বে বর্ষণ

বারবার পেটের সমস্যা? হতে পারে আইবিএসের লক্ষণ

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচন

vivo Y500 Goes on Sale with Exclusive Offers

আকর্ষণীয় অফারের সাথে যাত্রা শুরু করলো ভিভো ওয়াই৫০০

MetLife Bangladesh recognizes best insurance employees in financial inclusion and customer service

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকসেবায় সেরা বীমা কর্মীদের স্বীকৃতি দিল মেটলাইফ বাংলাদেশ

ঢাকায় আজ বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা, সামান্য বাড়তে পারে তাপমাত্রা