
মানিকগঞ্জে টানা অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যায় জেলার ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শত শত হেক্টর কৃষিজমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
বুধবার (২৯ জুলাই) কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পর্যালোচনা করে মানিকগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত সহায়তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার সবসময় রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে মানিকগঞ্জে ৩০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। অতিবৃষ্টিতে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি প্লাবিত হয়ে বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এবং মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জরুরি পুনর্বাসনের দাবি জানান। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন, দ্রুত সহায়তা না পেলে আগামী মৌসুমের কৃষি উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে এবং জেলার কৃষি অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে।
আফরোজা খানম বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা যেন দ্রুত চাষাবাদে ফিরতে পারেন, সে জন্য জরুরি ভিত্তিতে কৃষি প্রণোদনা, বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মানিকগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উৎপাদনকারী জেলা। ধান, পাট, সরিষা, ভুট্টা, মরিচ, পেঁপে ও বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদনে জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বড় অংশ ঢাকার বাজারে সরবরাহ করা হয়।
চলতি মৌসুমে জেলায় ৯০০ হেক্টর পেঁপে, ৪ হাজার ৫২১ হেক্টর সবজি, ২২১ হেক্টর পাট, ৪৩০ হেক্টর মরিচ এবং ১০ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলার আবাদ হওয়ার কথা ছিল। তবে অতিবৃষ্টিতে এসব ফসলের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে ২২২ হেক্টর জমির ফসল আংশিক এবং আরও প্রায় ৫২ হেক্টরের বেশি জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। কৃষি বিভাগের মূল্যায়নে এসব জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৭১ দশমিক ৫ মেট্রিক টন কৃষিপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
এই ক্ষতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলার ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষকের ওপর। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন। ফসল নষ্ট হওয়ায় তারা এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে আগামী মৌসুমে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, মন্ত্রীর পাঠানো চিঠি পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে বীজ, সার, চারা ও অন্যান্য কৃষি উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কৃষকদের পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।