ঢাকারবিবার , ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

১০–৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
জানুয়ারি ১৮, ২০২৬ ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ । ১২১ জন

দেশীয় স্পিনিং শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা, রপ্তানি খাতে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বিল অব এন্ট্রিতে কটন ইয়ার্নের কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ নিশ্চিত করতে এবং এইচএস কোডের অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছে।

গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউবিটিও সেল-২ থেকে স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর আহ্বানের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিঠিতে শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় সক্ষমতা জোরদারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস হেডিং ৫২.০৫, ৫২.০৬ ও ৫২.০৭-এর আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা থাকায় গত কয়েক বছরে এসব সুতার আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব এইচএস হেডিংয়ের আওতায় সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪১ হাজার মেট্রিক টনে এবং মূল্য ছাড়িয়ে যায় প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতেও আমদানির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের ব্যাখ্যায় চিঠিতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে আমদানি করা নিম্ন কাউন্টের সুতা দেশীয় বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়ায় স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। যদিও দেশে স্পিনিং মিলগুলোর পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, বাস্তবে বর্তমানে তারা মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন চালাচ্ছে, যা শিল্পটির আর্থিক টেকসই অবস্থানকে দুর্বল করে তুলছে।

এ অবস্থায় দেশীয় উৎপাদিত সুতার বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ইতোমধ্যে প্রায় ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও বহু প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও মিল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ উভয়ের জন্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করেছে, সুতা আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের তৈরি পোশাক খাতকে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর করে তুলছে। এতে টেক্সটাইল খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ দুর্বল হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্প কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো প্রধান রপ্তানি বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধার বড় অংশ হারাতে হবে। সে ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, সেপা বা জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে রপ্তানি পণ্যে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হবে। আমদানি করা সুতার ওপর নির্ভরতা থাকলে এসব শর্ত পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, বন্ড সুবিধা অব্যাহত থাকলে দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং উৎপাদন ব্যয় ও লিড টাইম বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি খাতের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাবে। বিপরীতে, নিম্ন কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় স্পিনিং শিল্পে ভারসাম্য ফিরে আসবে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে।