স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের রঙিন দুনিয়া শিশুদের জন্য কেবল বিনোদন নয়, বরং তাদের মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ এর একাধিক দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনী কৌশল শিশুদের মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গবেষকরা একে একটি ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
এই চাঞ্চল্যকর গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিশেষজ্ঞ ড. জেসন নাগুয়াতা (Dr. Jason Nagata) এবং সিনসিনাটি চিলড্রেন’স হাসপাতালের ডিআরআইভিই (DRIVE) প্রোগ্রামের পরিচালক ড. জন হাটন (Dr. John Hutton)। এছাড়াও গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের সেন্টার ফর অ্যাডিকশন মেডিসিন-এর গবেষক ড. কেলি ইভেন্স (Dr. Kelly Evens)। তারা ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের ওপর দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এই তথ্য পেয়েছেন।
মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে মূল গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ড. জন হাটন। তার পরীক্ষায় দেখা গেছে, দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী শিশুদের মস্তিষ্কের ‘হোয়াইট ম্যাটার’ (White Matter)-এর সংহতি কমে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের এই অংশটি ভাষা শেখা, তথ্যের আদান-প্রদান এবং মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। ড. হাটন সতর্ক করেছেন যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর কল্পনাশক্তি এবং চিন্তার গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে।
গবেষক ড. জেসন নাগুয়াতা তাঁর পর্যবেক্ষণে দেখিয়েছেন, শিশুরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন বারবার দেখে, তখন তাদের মগজে এটি ‘নিরাপদ’ হিসেবে গেঁথে যায়। গবেষকরা একে ‘ফেয়ারলি সেফ’ ধারণা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শিশুরা মনে করে, যা সর্বত্র দেখা যাচ্ছে তা ক্ষতিকর হতে পারে না। ফলে তারা অস্বাস্থ্যকর খাবার বা বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্যের প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং সেগুলোতে আসক্ত হয়ে যায়।
গবেষক ড. কেলি ইভেন্স বিজ্ঞাপনের সংস্পর্শে আসা এবং আসক্তির মধ্যে একটি গাণিতিক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডোজ-রেসপন্স রিলেশনশিপ’ বলা হয়। অর্থাৎ, একটি শিশু যত বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায় এবং বিজ্ঞাপন দেখে, তার আসক্ত হওয়ার প্রবণতা তত বৃদ্ধি পায়। ড. ইভেন্সের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় কিশোর-কিশোরীরা বিজ্ঞাপনের চটকদার মোড়ক দ্বারা সহজেই বিভ্রান্ত হয়।
গবেষণায় এই আসক্তির জন্য মূলত বিজ্ঞাপনী সংস্থা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমকে দায়ী করা হয়েছে। তারা শিশুদের পছন্দ-অপছন্দ বিশ্লেষণ করে তাদের লক্ষ্য করে সরাসরি প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপন প্রচার করে। অনেক ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ডিজিটাল গেম বা রঙিন পানীয় এমন মোড়কে আনা হয় যা শিশুদের দ্রুত প্রলুব্ধ করে। গবেষকরা একে এক ধরণের ‘টার্গেটেড ম্যানিপুলেশন’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারসাজি হিসেবে দেখছেন।
এই আসক্তির ফলে শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশেও ইদানীং শিশুদের মধ্যে কথা বলতে দেরি হওয়া এবং খিটখিটে মেজাজের প্রবণতা বাড়ছে, যার অন্যতম কারণ এই স্ক্রিন আসক্তি বলে মনে করেন গবেষকরা। এটি তাদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এদিকে এই মহামারি রুখতে ল্যানসেট এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রধান সুপারিশ করেছেন। সেগুলো হলো-
বিজ্ঞাপনে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা: অপ্রাপ্তবয়স্কদের লক্ষ্য করে যেকোনো ধরণের প্রলুব্ধকর বা ক্ষতিকর পণ্যের বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশিপ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
প্রযুক্তিভিত্তিক চিকিৎসা: আসক্তি নিরসনে ইন্টারনেট-ভিত্তিক কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) প্রয়োগ করা, যা তাদের নেতিবাচক চিন্তাধারা পরিবর্তনে সহায়ক। মূলত এটি শিশুদের লজিক বা যুক্তির মাধ্যমে বোঝায় যে, বিজ্ঞাপনে যা দেখা যাচ্ছে তার পেছনের উদ্দেশ্য কী।
প্রশাসনিক কঠোরতা: ইন্টারনেটে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়স যাচাইয়ের কঠোর ব্যবস্থা এবং সঠিক নীতিমালা প্রয়োগ করা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ল্যানসেটের এই বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা বাংলাদেশের অভিভাবকদের জন্য একটি জরুরি সংকেত। শিশুদের নিরাপদ রাখতে এখনই পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


