
সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ল্যাব টেকনিশিয়ানের আকস্মিক মৃত্যুর পরও রাশিয়ায় প্লেগ মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। গত সপ্তাহে ২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভা মারা যাওয়ার পর তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত অসুস্থতার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
শিপিলোভা অসুস্থ হওয়ার দুই দিন পর গত সপ্তাহে মারা যান। রুশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন সেখানে বিপজ্জনক জীবাণু সংরক্ষণ ও গবেষণা করা হয়। কর্মস্থলে একটি দুর্ঘটনার মাধ্যমে তিনি সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে রুশ কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে জানিয়েছে, শিপিলোভা ‘অজানা কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়া’য় মারা গেছেন। ইরকুটস্ক শহরের ওই গবেষণা কেন্দ্র এবং পার্শ্ববর্তী কয়েকটি হাসপাতালে কঠোর কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেইয়ার জানান, রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, শিপিলোভা যাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাদের সবাইকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং অসুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা দিচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কারও মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়নি।
শিপিলোভা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট নিউমোনিক প্লেগে মারা গেছেন কি না, সে বিষয়ে রুশ কর্মকর্তারা এখনও তদন্ত করছেন বলেও জানান তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নে স্বাস্থ্যঝুঁকি ইরকুটস্কের জন্য ‘মাঝারি থেকে কম’, রাশিয়ার বাকি অংশের জন্য ‘কম’ এবং ইউরোপের জন্য ‘খুবই কম’।
এদিকে, মঙ্গলবার WHO-এর মহাপরিচালক টেডরস আধানম গেব্রেইয়েসুস ঘটনাটি নিয়ে রাশিয়াকে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে এবং জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধিমালার আওতায় সময়মতো, পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তথ্য আদান-প্রদান জরুরি।
রুশ গণমাধ্যমের তথ্যমতে, শিপিলোভা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেখানকার প্রায় ৬০ জন সহকর্মীকে শুক্রবার থেকে ভবনের ভেতরেই রাখা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলাকালে তারা মেঝে ও চেয়ারেই রাত কাটাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি হাসপাতালেও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং রোগীদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে রাশিয়ার স্বাস্থ্য তদারকি সংস্থা ‘রোসপোট্রেবনাডজোর’-এর বিবৃতির ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরকুটস্কের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে এবং ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার নতুন কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মস্কোর প্রতি ঘটনাটি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্বের কাছে রাশিয়ার আরও তথ্য প্রকাশ করা জরুরি এবং যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।
‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর রাশিয়ার কাছে একটি গোপনীয় কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে। ‘ডিমারশ’ নামে পরিচিত ওই বার্তায় বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের বিষয়ে মস্কোকে সতর্ক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি শিগগিরই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলবেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার একটি ফোনালাপের সময় নির্ধারিত রয়েছে এবং আলোচনা খুব শিগগিরই হবে।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাশিয়াকে সহায়তা করতে তার প্রশাসন প্রস্তুত। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে দেখে তার খারাপ লাগছে এবং প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে।
অন্যদিকে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রোসপোট্রেবনাডজোর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সহায়তা করতে রাশিয়া প্রস্তুত। সংস্থাটি দাবি করেছে, বিপজ্জনক সংক্রামক রোগের পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গরাজ্যে হামের পরিস্থিতির ‘উল্লেখযোগ্য অবনতি’ এবং জুন মাসে নিউ মেক্সিকোতে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।