অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশে সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যখাতে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই-এমন অভিমত দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, দল-মত নির্বিশেষে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব মতামত উঠে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্যখাত এগিয়ে গেলে দেশ এগোবে, গড়ে উঠবে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ। এজন্য স্বাস্থ্যখাতে কার্যকর সমন্বয় ও বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।
আলোচনায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। তিনি বলেন, “প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (পিএইচসি) বিষয়ে একটি আলাদা অধ্যাদেশ আইন প্রয়োজন। সকল নাগরিকের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিকে ন্যায্যতা ও বৈষম্যহীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।”
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন স্বাস্থ্যখাতে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে, যাতে দেশের সকল নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা পান।
ব্র্যাকের সিনিয়র পরিচালক আকরামুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্যখাতে সেবা ও মান-দুটোই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, “বর্তমান কাঠামোতে স্বাস্থ্যখাতকে বেশিদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মানে সমতা আনতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রোমানা হক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো নির্ধারণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ে কতজন চিকিৎসক ও কী ধরনের স্বাস্থ্য টিম থাকবে-তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। একটি নির্দিষ্ট মডেল ছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে এগোলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে না।”
অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম বলেন, দক্ষ মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার ছাড়া স্বাস্থ্যখাত এগোনো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “৯-১০ হাজার প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ কর্মহীন অবস্থায় আছেন। তাদের কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।”
স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান দুরবস্থার জন্য দায় নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) কাজী দেলোয়ার হোসেন বলেন, “স্বাস্থ্যখাতের দুর্দশার জন্য ৫০ শতাংশ দায়ী চিকিৎসকরা, ৩০ শতাংশ আমলারা এবং ২০ শতাংশ রাজনীতিবিদরা।” তিনি বলেন, সরকারের ভেতরের জটিলতা ও আন্তঃমন্ত্রণালয়গত সমন্বয়হীনতা স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের বড় বাধা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কথা বলা হলেও উভয়ের লক্ষ্য এক নয়। বেসরকারি খাতের মূল লক্ষ্য মুনাফা।”
ডাক্তারদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা শিক্ষায় ছাড় দেওয়ার প্রবণতারও সমালোচনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


