
Cardiopulmonary resuscitation. Rescue team (doctor and a paramedic) resuscitating the man on the street.
দেশের জাতীয় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলো বরাবরই দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও দ্রুতগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব আকস্মিক দুর্ঘটনায় আহত মানুষদের হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ মুহূর্তের সময়টুকু জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে সূক্ষ্ম রেখা টেনে দেয়। অনেক সময়ই সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা বা হাসপাতালে নেওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় পথেই বহু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বা ‘কমিউনিটি ফার্স্ট রেসপন্ডাররা’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-র সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সড়কে এসব মানুষের সাহসী ও জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাথমিক চিকিৎসার সংকট :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারান, যার একটি বড় অংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটার পর তাৎক্ষণিকভাবে পেশাদার অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসাসেবা পৌঁছাতে অনেক সময়ই দেরি হয়ে যায়। ট্রাফিক জ্যাম, দূরবর্তী হাসপাতাল এবং যোগাযোগের নানা জটিলতার কারণে এই সোনালী সময় (গোল্ডেন আওয়ার) হাতছাড়া হয়ে যায়।
গোল্ডেন আওয়ার বলতে দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রথম এক ঘণ্টাকে বোঝানো হয়, যে সময়ের মধ্যে সঠিক চিকিৎসা বা রক্তক্ষরণ বন্ধ করা গেলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু অতীতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে আশপাশের সাধারণ মানুষ বা পথচারীরা দুর্ঘটনায় আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে অনেক সময় ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ করতেন, যা হিতে বিপরীত হতো। ঠিক এই জায়গাটিতেই বিপ্লব ঘটিয়েছেন স্থানীয় যুবসমাজ ও কমিউনিটির মানুষজন, যারা স্বউদ্যোগে প্রাথমিক সেবক (ফার্স্ট রেসপন্ডার) হিসেবে কাজ করছেন।
ফার্স্ট রেসপন্ডারদের প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধান এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার তরুণ ও স্থানীয় দোকানদার, চালক ও যুবকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে এই স্বেচ্ছাসেবক দল। তাদের সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এই প্রশিক্ষণের আওতায় তারা যা শিখছেন এবং বাস্তবে প্রয়োগ করছেন তার মধ্যে রয়েছে- মারাত্মক জখম থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া রোধ করতে সঠিকভাবে ড্রেসিং ও প্রেসার ব্যান্ডেজ ব্যবহার করা। আহত ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট রোধে তার মুখ ও শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক ভঙ্গিতে শোয়ানো। মেরুদণ্ড বা হাড়ের আঘাতপ্রাপ্তদের ভুলভাবে না নাড়িয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্ট্রেচার বা নিরাপদ পদ্ধতিতে হাসপাতালে বা অ্যাম্বুলেন্সে তোলা। দ্রুত ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও নিকটস্থ হাসপাতালে খবর পাঠানোর কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করা।
স্থানীয় এই স্বেচ্ছাসেবকরা দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং পেশাদার চিকিৎসকরা পৌঁছানোর আগেই জীবন রক্ষাকারী প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মানুষগুলোর তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপের কারণে শত শত মানুষের জীবন রক্ষা পাচ্ছে, যা দেশের আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। ডব্লিউএইচও মনে করে, বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা যেকোনো দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অবিশ্বাস্য ফল বয়ে আনতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রশিক্ষিত ফার্স্ট রেসপন্ডার মডেলটিকে দেশের প্রতিটি জেলার দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এটি কেবল সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের জীবনই বাঁচাচ্ছে না, বরং সমাজের মধ্যে দুর্যোগ ও দুর্ঘটনায় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক অভূতপূর্ব মানসিকতা তৈরি করছে।
বাংলাদেশে এর প্রভাব :
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদী কাজগুলোর পাশাপাশি তাৎক্ষণিক জীবন রক্ষার এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে—যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ছোট ছোট বাজার বা জনপদের যুবকরা যখন এই প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান লাভ করেন, তখন তারা হয়ে ওঠেন ওই এলাকার একেকজন জীবন্ত জীবন রক্ষাকারী প্রহরী।
বিশেষ করে রাতের বেলা যখন বড় দুর্ঘটনা ঘটে এবং তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসাসেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন এই স্থানীয় ফার্স্ট রেসপন্ডাররাই একমাত্র ভরসা হিসেবে কাজ করেন। তাদের দ্রুত পদক্ষেপে বহু মানুষ আজ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক আইনের কড়াকড়ি এবং আধুনিক যানবাহনের সুরক্ষা ব্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমনি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আহত ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে তাৎক্ষণিক ফার্স্ট রেসপন্ডারের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। এই ধরনের কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগকে সরকারিভাবে আরও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে দেশের সড়ক মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।