
সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো মানুষটিকে যখন দেখা যায়, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে কেবল তার মুকুটে যুক্ত হওয়া নতুন কোনো ফলক বা বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কিন্তু সেই সাফল্যের ঠিক পেছনে লুকিয়ে থাকা বছরের পর বছর ধরে চলা অমানুষিক পরিশ্রম, একের পর এক ব্যর্থ পরীক্ষা আর ত্যাগের ইতিহাস কজনই বা রাখি? চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডেইসারথের জীবন ঠিক এমনই এক না বলা অধ্যায়, যা তরুণ প্রজন্ম এবং গবেষকদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
১৯৭১ সালের ১৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে জন্ম নেওয়া কার্ল ডেইসারথ কেবল একজন সাধারণ গবেষক নন। তিনি একই সঙ্গে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (প্র্যাক্টিসিং সাইকিয়াস্ট্র) এবং বায়োইঞ্জিনিয়ার। মানুষের মস্তিষ্কের জটিলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত রোগগুলো তাকে সবসময় ভাবাত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োকেমিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক শেষ করার পর তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউরোসায়েন্সে পিএইচডি এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। মানব মস্তিষ্কের রোগ ও এর কার্যপদ্ধতি বোঝার তাগিদ থেকেই তিনি বেছে নেন অত্যন্ত কঠিন এক পথ।
কার্ল ডেইসারথ এবং তার সহকর্মীরা মিলে সৃষ্টি করেছিলেন ‘অপটোজেনেটিক্স’ নামক এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি। সহজ কথায়, আলো ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ বা নিউরণের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি এটি। ২০০৫ সালে তিনি যখন প্রথম ইঁদুরের স্নায়ুকোষে এই আলোর মাধ্যমে সংকেত পাঠানোর বিষয়টি সফলভাবে প্রদর্শন করেন, তখন তা স্নায়ুবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিল। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন কীভাবে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষগুলো স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষদের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে কিংবা পার্কিনসনস বা মানসিক অবসাদের মতো জটিল রোগ চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। পাশাপাশি, তিনি টিস্যুকে স্বচ্ছ করার প্রযুক্তিও আবিষ্কার করেন, যা মস্তিষ্কের ভেতরের গঠন নিখুঁতভাবে দেখতে সাহায্য করে।
একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডেইসারথ প্রতিদিন একদিকে যেমন রোগীদের সেবা দিয়েছেন, অন্যদিকে নিজের গবেষণাগারে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন অন্তহীন সাধনায়। গবেষণার জন্য গ্রান্ট প্রপোজাল লেখা, শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র পিয়ার রিভিউ করা, ব্যর্থ হওয়া পরীক্ষাগুলোকে বারবার নতুন করে শুরু করা—এই রুটিন ছিল তার জীবনের নিত্যসঙ্গী। চাইলেই তিনি অন্য পেশা বেছে নিয়ে আরামদায়ক ও অর্থবিত্তের জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু মানবজাতির কল্যাণে নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশা তাকে আটকে রেখেছিল ল্যাবরেটরির চার দেওয়ালে।
যখন তার নোবেল জয়ের খবর এল, তখন চারদিক থেকে ছুটে আসে অভিনন্দন আর সাংবাদিকদের ভিড়। কিন্তু সেই ব্যস্ততম দিনেও নিজের পারিবারিক দায়িত্ব ভোলেননি তিনি। নোবেল পাওয়ার আনন্দের মাঝেই একটু বিরতি নিয়ে নিজের সন্তানদের স্কুলের জন্য দুপুরের খাবার (টিফিন) প্রস্তুত করেছিলেন। বিশ্বমাতানো একজন বিজ্ঞানী যখন ঘরে ফিরে সাধারণ একজন মমতাময়ী বাবার ভূমিকা পালন করেন, তখন তা প্রমাণ করে যে বড় মানুষ হওয়ার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে সরলতা ও শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতায়।
তার পরিবারেও রয়েছে বিজ্ঞানের দারুণ ছোঁয়া। কার্ল ডেইসারথের স্ত্রী মিশেল মনজে-ডেইসারথ নিজেও স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের একজন অধ্যাপক, চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী। বাবা ও মা উভয়েরই জীবন যখন বিজ্ঞান, গবেষণা আর শিক্ষার্থীদের ঘিরে, তখন তাদের সন্তানরাও বেড়ে উঠছে এক অনন্য আদর্শের মধ্যে।
কার্ল ডেইসারথের জীবন এই শিক্ষাই দেয় যে, রাতারাতি কোনো বড় সাফল্য আসে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ সাধনা, ব্যর্থতাকে জয় করার জেদ আর মানবকল্যাণের এক গভীর মানসিকতা। পৃথিবীর হাজার হাজার গবেষক বা বিজ্ঞানী হয়তো কোনো দিন নোবেল পাবেন না, কিন্তু তিল তিল করে সমাজ ও বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার তাদের এই অদম্য প্রয়াসই মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। ল্যাবরেটরির নিঃসঙ্গ রাত থেকে নোবেলের আলোয় পৌঁছানোর কার্ল ডেইসারথের এই গল্প তাই কেবল একজন বিজ্ঞানীর জয়গাথা নয়, এটি যেকোনো ক্ষেত্রের মানুষের জন্য কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সততার এক অনন্য অনুপ্রেরণা।