ঢাকাবুধবার , ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বিশ্বজুড়ে তীব্র হচ্ছে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ, বাড়ছে বিপদের ঘণ্টা

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৩ সকাল

Link Copied!

জলবায়ু পরিবর্তন এবং এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে রেকর্ড সৃষ্টিকারী সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ (মেরিন হিটওয়েভ) চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জলজ জীবনব্যবস্থা ও উপকূলীয় পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সম্প্রতি পরিবেশবিষয়ক পোর্টাল ‘ইয়েল এনভায়রনমেন্ট থ্রি সিক্সটি’-এর প্রতিবেদনে মহাসাগরের এই উষ্ণায়ন এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাবগুলো উঠে এসেছে।

সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির উদ্বেগজনক হার :

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে গত ৪০ বছরে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের হার ও তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকদের মতে, অতীতের তুলনায় বর্তমান সময়ে এ ধরনের তাপপ্রবাহ প্রায় ২০ গুণেরও বেশি ঘন ঘন ঘটছে। ১৯৮০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে যে মাত্রার তাপপ্রবাহ দেখা যেত, বর্তমানে তার স্থায়িত্ব, তাপমাত্রা এবং ব্যাপ্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে। অতীতে যেখানে স্বল্পমেয়াদী ও কম তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা যেত, বর্তমানে তা দীর্ঘস্থায়ী ও অত্যন্ত উগ্র রূপ ধারণ করেছে।

জলজ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব :

মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ছে। এর ফলে সৃষ্ট প্রধান সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে-

প্রবাল প্রাচীরের মৃত্যু: অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে প্রবালগুলো তাদের রঙ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগানো শৈবাল হারিয়ে সাদা হয়ে যায়, যাকে প্রবাল ব্লিচিং বলে। বিশ্বজুড়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলের বিখ্যাত প্রবাল প্রাচীরগুলো আজ ধ্বংসের মুখে।

খাদ্য শৃঙ্খলে বিঘ্ন: মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়লে ফাইটোপ্লাংকটনের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে, যা সামুদ্রিক খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তি। এর প্রভাব ওপরের স্তরের খাদক যেমন মাছ, সামুদ্রিক পাখি এবং তিমি বা ডলফিনের মতো বৃহৎ সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও পড়ে।

মাছের প্রজনন ও গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন: অতিরিক্ত গরম পানির কারণে অনেক মাছ ও জলজ প্রাণী তাদের চিরাচরিত আবাসস্থল ছেড়ে ঠান্ডা পানির খোঁজে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবী ও অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এছাড়া, ক্ষতিকারক অ্যালগাল ব্লুম বা বিষাক্ত শেওলার প্রাদুর্ভাবও এসব তাপপ্রবাহের সময় বহুগুণ বেড়ে যায়, যা জলজ প্রাণীর অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়।

উষ্ণায়নের নেপথ্য কারণ ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা :

বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি শোষণ করে নেয় মহাসাগরগুলো। এর ফলে সমুদ্রের পানির স্বাভাবিক তাপ ধারণক্ষমতা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, যদি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সীমিত রাখা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এই সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। কার্বন নিঃসর্গ কমানো এবং কার্যকর জলবায়ু নীতি বাস্তবায়ন করা না গেলে সমুদ্রের অনেক মূল্যবান প্রজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট :

বিশ্বের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের মতো বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগর অববাহিকাও সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে নয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই প্রবণতা দেশের আবহাওয়া, অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর সুদূরপ্রসারী ক্ষতি ডেকে আনছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের দিনগুলোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরের এই অস্বাভাবিক উষ্ণায়ন ও সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ সরাসরি প্রলয়ঙ্করী ঝড় ও সাইক্লোনকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মোখা বা রিমালের মতো অতি প্রবল ঝড়গুলোর পেছনে এই উষ্ণ সমুদ্রের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

তাছাড়া, তাপপ্রবাহের ফলে বঙ্গোপসাগরের মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক সংকটে পড়েছে। সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ জেলের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রমবর্ধমান অভিঘাত থেকে রক্ষা পেতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী অভিযোজন ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য :

এ বিষয়ে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস-এর জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিশেষজ্ঞ ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট অ্যালার্ম বেল। সমুদ্রের ওপরের স্তরের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে সাইক্লোনগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করে উপকূলে আঘাত হানছে। এটি শুধু উপকূলের ঘরবাড়ির ক্ষতি করছে না, বরং সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের চেইন ভেঙে দিচ্ছে।

উপকূলীয় জনপদের জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি মাজেদুল হক বলেন, প্রতি বছর উপকূলের মানুষ ভাঙন আর জলোচ্ছ্বাসের মুখোমুখি হচ্ছে। সাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে মাছ কমে যাওয়ায় জেলেদের জালে এখন কাঙ্ক্ষিত ইলিশ বা সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে না। অবিলম্বে স্থানীয় জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও অভিযোজনমূলক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে উপকূলের অর্থনীতি বড় ধরণের ধসের মুখে পড়বে।

সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ কেবল সমুদ্রের নিচের নীরব জগৎকেই ধ্বংস করছে না, বরং তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানবজাতির খাদ্য নিরাপত্তা, আবহাওয়া এবং উপকূলীয় অর্থনীতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকৃতির এই নীরব সংকট মোকাবিলায় এখনই বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

২০৩০ সালের মধ্যে ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করবে পিডিবি

সিলেটের পর্যটন-চা ও শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

দেশের ৫ বিভাগে ভারী বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা

খিলক্ষেতে ট্রেনের ধাক্কায় অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যু

চাঁদপুরে ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২

চিরিরবন্দরে ধানখেতে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু

vivo V80 Lite: A Perfect Fit for Everyday Lifestyles

স্মার্ট লাইফের পারফেক্ট সঙ্গী ভিভো ভি৮০ লাইট

‘Redmin Horizon 2026’ Held to Build a Self-Reliant Bangladesh in the Chemical and Industrial Sector

কেমিক্যাল ও শিল্পখাতে স্বনির্ভরতার অঙ্গীকার নিয়ে ‘রেডমিন হরাইজন -২০২৬’আয়োজন

বিশ্বজুড়ে তীব্র হচ্ছে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ, বাড়ছে বিপদের ঘণ্টা

মার্কিন গণতন্ত্রের সূচক ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, বাংলাদেশর উন্নতি