
পড়ন্ত বিকেলে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন শরীফুল ইসলাম। দুই হাতে দুই সন্তানের ছোট্ট হাত। প্রায় ২০ বছর ধরে মিরপুরে বসবাস করলেও এমন মুহূর্ত তার জীবনে এটাই প্রথম। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এত বছরে কখনোই দুই সন্তানের হাত ধরে এই পথে হাঁটতে পারিনি, আজ পারছি। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
শরীফুল ইসলামের মতো স্বস্তির অনুভূতি এখন মিরপুরের হাজারো মানুষের। একসময় যে ফুটপাতে পা ফেলার জায়গা ছিল না, সেখানে এখন নির্বিঘ্নে হাঁটছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিজীবী, বয়স্ক মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সড়ক ও ফুটপাত ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছেন। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের যে অংশটি এতদিন অবৈধ দখলে ছিল, সেখানে গাছ লাগিয়ে পথচারীদের জন্য সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি। দোকানপাট ও মানুষের ভিড়ের চিরচেনা দৃশ্য বদলে মিরপুর-১০ যেন পেয়েছে নতুন চেহারা।
কিছুদিন আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও হোপ স্কুল রোডে সড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে গড়ে উঠেছিল অবৈধ ফুটপাতের বাজার। বিশেষ করে হোপ স্কুল ও মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলের সামনের ফুটপাত ও সড়কজুড়ে বসত সারি সারি দোকান। এসব দোকান থেকে হকারদের উচ্চস্বরে হাঁকডাকও মিরপুরবাসীর ভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল।
দোকানপাটের কারণে গোলচত্বর থেকে পূর্বদিকের তিনটি সড়কের মুখে প্রায়ই সাধারণ মানুষ ও যানবাহনের ভিড় লেগে থাকত। এতে পথচারীদের পাশাপাশি যানবাহন চলাচলেও সৃষ্টি হতো প্রতিবন্ধকতা। নিয়মিত দুর্ভোগ পোহাতে হতো উভয় পক্ষকেই।
নগরবাসীর এই দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালায় ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। এরপর মিরপুর-১০ ও হোপ স্কুলের সামনের অবৈধ ফুটপাতের বাজার পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়। উচ্ছেদ অভিযানে এলাকার সাধারণ মানুষও সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করেন।
উচ্ছেদ অভিযানের পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে বলেন, এ উদ্যোগ শুধু মিরপুরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উত্তর সিটির প্রতিটি এলাকার ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট দখলমুক্ত করা হবে। উচ্ছেদের পর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ পুনরায় দোকান বসিয়ে মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরিমানার পাশাপাশি দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, নগরবাসী যেন সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদে চলাচল করতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়ক ও ফুটপাত দখল করে যারা অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়াচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
হকারদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জীবিকার জন্য হকারদের ব্যবসার সুযোগ অবশ্যই থাকবে। তবে তা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নয়। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানেই তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। মানুষের চলাচলের পথ আর কারও দখলে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
প্রশাসনের এই উদ্যোগের সুফল সবচেয়ে কাছ থেকে দেখছেন সড়কে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। মিরপুর-১০ নম্বরে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক সার্জেন্ট আব্দুল আজিজ বলেন, আগে মনে হতো যেন একটি বাজারের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চলছে। ফুটপাত দখল থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটত। ফলে তীব্র যানজট হতো। এখন রাস্তা অনেক ফাঁকা, যানজটও তেমন নেই। রাস্তায় গাড়ি চলছে, ফুটপাতে মানুষ হাঁটছে। এতে তাদের কাজের চাপও কমেছে।
ট্রাফিক পুলিশের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত শিক্ষক সমাজও। ঢাকার নর্থ সিটি কলেজের প্রভাষক আবু বক্কর সরকার উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে তার চাওয়া, ফুটপাত সবসময় দখলমুক্ত থাকুক, যাতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। তিনি ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানকে ধন্যবাদ জানান এবং পুরো সিটি করপোরেশন এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার দাবি জানান।
মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক বলেন, এটি তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। আগে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটলে স্বস্তি পাওয়া যেত না। এখন পরিবেশ অনেক ভালো লাগছে।
শিক্ষকদের মতো স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষার্থীদের মনেও। মিরপুরে বসবাসরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ অহোনা বলেন, প্রতিদিন মিরপুর-১০ থেকে মেট্রোরেলে ক্যাম্পাসে যেতে হয়। আগে বাসা থেকে বেরিয়ে দোকান ও ভিড় ঠেলে স্টেশনে পৌঁছাতেই অনেক সময় চলে যেত। প্রায়ই ক্লাসে দেরি হতো। এখন খোলা ফুটপাত ধরে কয়েক মিনিটেই স্টেশনে পৌঁছে যাওয়া যায়। সন্ধ্যায় ক্লাস শেষে ফেরার পথেও নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্বস্তি ফিরেছে অভিভাবকদের মধ্যেও। মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুল থেকে সন্তানকে নিয়ে বাসায় ফেরার সময় এক মা বলেন, এমন পরিবেশে আগে কখনো হাঁটা হয়নি। এখন সন্তানকে নিয়ে নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারছেন।
ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন স্থায়ী ব্যবসায়ীরাও। শাহ আলী প্লাজার বিক্রেতা শাহজাহান বলেন, উচ্ছেদের পর রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছে। আগে যারা বাইরের ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করতেন, তারা এখন মার্কেটে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে মার্কেটে ব্যবসা করা তাদের মতো ব্যবসায়ীদের বেচাকেনাও বেড়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আনোয়ার জাহিদ বলেন, তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে মিরপুরে বসবাস করছেন। একসময় এই রাস্তা খোলামেলা ছিল। পরে এমন অবস্থা হয়েছিল যে ফুটপাত আর হাঁটার উপযোগী ছিল না। ফুটপাতের দোকানের কারণে মার্কেটের দোকানগুলোতেও বেচাকেনা কমে গিয়েছিল। এখন রাস্তাঘাট অনেক পরিচ্ছন্ন।
শুধু পথচারী ও ব্যবসায়ী নন, স্বস্তি পাচ্ছেন যানবাহনের চালকরাও। গাড়িচালক আমির বলেন, আগে মিরপুর-১০ থেকে বিআরটিএ পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যেতে অনেক সময় লাগত, খুব কষ্ট হতো। এখন অল্প সময়েই এই সড়ক পার হওয়া যাচ্ছে।
সময় বাঁচার কথাও জানান পথচারী শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে এই পথটুকু পার হতে প্রায় ২০ মিনিট লাগত। এখন তিন-চার মিনিটেই পার হয়ে যাওয়া যায়। পুরো ঢাকা শহর এমন সুন্দর ও নিরাপদ থাকুক—এটাই তার প্রত্যাশা।
নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে বেসরকারি একটি ক্যাবল কোম্পানির এক কর্মী বলেন, আগে ভিড়ের মধ্যে পকেটমারের ভয় ছিল। এখন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছেন।
আরেক পথচারী শফিক শাকিল বলেন, সকালে হাঁটতে বের হয়ে দেখেছেন, আগের মতো ফুটপাতজুড়ে আর দোকানের সারি নেই। পুরো পথটাই খোলা। সরকারের এমন উদ্যোগের প্রশংসা না করে পারছেন না তিনি।
দখলমুক্ত ফুটপাতে স্বস্তির এই চিত্রে খুশি মিরপুরবাসী। তাদের প্রত্যাশা, মিরপুর-১০ নম্বরের মতো নগরীর প্রতিটি ফুটপাতই ফিরে যাবে পথচারীদের কাছে। একই সঙ্গে নগরবাসী পাবে নিরাপদ, সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচলের পথ।