বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৫ জন কোনো না কোনো হৃদরোগে ভুগছেন, যার একটি বড় অংশই হার্ট ফেইলিউর। প্রতিদিন গড়ে ৫৬২ জন হৃদরোগে মারা যান, যার অন্যতম প্রধান কারণ হার্ট ফেইলিউর। আক্রান্তদের বড় অংশ ৫০ থেকে ৭০ বছর বয়সী। গবেষণায় দেখা গেছে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি (প্রায় ৭০-৮০%)। ২০০০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী হার্ট ফেইলিউর রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ (২৩ মিলিয়ন), বর্তমানে তা ৬ কোটি ৪০ লক্ষে পৌঁছেছে (ESC Guidelines)। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ধূমপান এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাব এ দেশে রোগীর সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ।
হার্ট ফেইলিউর হলো এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা যেখানে হৃদপিণ্ড শরীরের চাহিদামত পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না। সাধারণত দুই পা ফুলে যাওয়া, ক্লান্তি বোধ, শ্বাসকষ্ট নিয়ে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন।
লক্ষণসমূহ
শ্বাসকষ্ট (Breathlessness): অল্প পরিশ্রমে বা শুয়ে থাকলে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
শরীরে ফোলা ভাব (Edema): পা, গোড়ালি বা পেটে পানি জমে ফুলে যাওয়া
ক্লান্তি (Tiredness): সারাদিন প্রচণ্ড দুর্বলতা বা হাঁটতে গেলে দুর্বলতা
কাশি (Cough): ক্রমাগত কাশি বা সাদা/গোলাপী কফ
ধড়ফড় (Palpitation): দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
এছাড়া Confusion / Depression / Syncope (কিছু সময়ের জন্য জ্ঞান হারানো) এসব বয়স্ক রোগীদের মাঝে দেখা যায়
হার্ট ফেইলিউরের কারণ
১. করোনারি আর্টারি ডিজিজ (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন / এনজাইনা)
২. উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস: বাংলাদেশে হার্ট ফেইলিউর রোগীদের অর্ধেকের বেশি (৪৯-৮০%) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন
৩. ভালভুলার হার্ট ডিজিজ (হার্ট ভালবের সমস্যা / বাতজ্বর / জন্মগত হার্ট ডিজিজ)
৪. অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (এরিদমিয়া)
৫. কার্ডিওমায়োপ্যাথি (উচ্চ রক্তচাপ, প্রেগন্যান্সি জটিলতা, এলকোহল, কোকেইন)
৬. ইনফেকশন (এইচআইভি, ভাইরাস, লাইম ডিজিজ)
৭. এছাড়াও মেটাবলিক, এন্ডোমায়োকার্ডিয়াল, নিউরোমাসকুলার ডিজিজেও হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা (Diagnosis & Treatment)
চিকিৎসকরা সাধারণত শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram), ইসিজি (ECG), এবং রক্ত পরীক্ষা (BNP test), এক্স-রে (Chest X-ray) এর মাধ্যমে হার্ট ফেইলিউর শনাক্ত করেন। এছাড়াও CBC, Urea, Electrolyte, S iron profile, TSH টেস্টগুলোও কারণ নির্ণয়ে প্রয়োজন হয়।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI Based Diagnosis)
(AI risk factor বিশ্লেষণ, differential diagnosis তৈরি এবং স্কোর ভিত্তিক ডায়াগনোসিসে সহায়তা করে) এক্স-রে, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, এমআরআই ইমেজিংয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বড় ভূমিকা রাখছে।
চিকিৎসা ও জীবনযাত্রা
চিকিৎসা: এটি সাধারণ ওষুধ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে পেসমেকার, ICD বা হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন হতে পারে।
• হার্ট ফেইলিউরে জটিলতা এড়াতে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন দেওয়া হয়
জীবনযাত্রার পরিবর্তন (Lifestyle Changes)
• লবণ কম খাওয়া: প্রতিদিন ৫ গ্রামের (১ চামচ) কম
• ধূমপান ত্যাগ: ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন
• ওজন নিয়ন্ত্রণ: সুস্থ ওজন বজায় রাখা
• নিয়মিত হাঁটা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা ব্যায়াম
• ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
• পরিমিত পানি পান
হার্ট ফেইলিউর একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ হলেও সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগীরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
লেখক : ডা. অনিন্দ্য চৌধুরী পরাগ, এমবিবিএস বিসিএস, এফসিপিএস (কার্ডিওলজি) শেষ বর্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


