ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

অর্থনীতিবিদগণের বিবৃতি

জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ১২, ২০২৬ ৩:৩২ অপরাহ্ণ । ২ জন

জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করার দাবী জানিয়েছে দেশের ১২ জন ক্ষাতমান অর্থনীতিবিদ। আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ ২০২৬) দুপরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা এই দাবী জানান।

বিবৃতিতে তারা বলেন, ২০০৫ আইনটি পাস হয় এবং ২০১৩ সালে এটিকে সংশোধন করা হয়। দুই দশক ধরে বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায় আইনটির কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত হওয়ায় আইনটি পুনঃসংশোধনের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ধারাবাহিকভাবে কোন আইনকে সময়োপযোগী, কার্যকরী ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ বিশ্বের সব দেশের জন্যই একটি স্বাভাবিক অনুসরণীয় পদ্ধতি।

অন্তরবর্তীকালীন সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটিকে আরো শক্তিশালী করে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করে। জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা জরুরি বলে মনে করেন দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদগণ।

বিবৃতিতে তারা আরো বলেন, নির্বাচিত নতুন সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। আমরা গণমাধ্যমের সংবাদে জানতে পেরেছি যে, সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটিকে আইনে রুপান্তরিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে বলা হয়, অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করার সরকারের উদ্যোগকে ব্যহত করতে সিগারেট কোম্পানি বরাবরের মতো নানা বিভ্রান্তকর প্রচারণা চলাচ্ছে। অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করা হলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে বলে প্রচারণা চালাচ্ছে সিগারেট কোম্পানিগুলো। তামাকজাত দ্রবের মূল্য ও কর বৃদ্ধির বিরোধিতা করতেও তারা একই কথা বলে থাকে। মূলত তামাক কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকারকে বিভ্রান্ত করছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করতে এটি তামাক কোম্পানির অনেক পুরানো অপকৌশল।

ধারাবাহিক রাজস্ব বৃদ্ধির উপাত্ত তুলেধরে বিবৃতিতে তারা বলেন, বাংলাদেশে ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাসের বছর তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় ছিলো ২ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকায়। একইভাবে ২০১৩ সালে আইন সংশোধনের বছর রাজস্ব আয় ছিল ১০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, পরের অর্থবছরে যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকায়। পরবর্তী বছরগুলোতে এই বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে মোট ৪০ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। গত ২০ বছরে এই খাত থেকে রাজস্ব আয় বেড়েছে ১৪ গুণ। অতএব এটা পরিষ্কার যে তামাক নিয়ন্ত্রণ হলেও তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও করহার বাড়ানো হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ে।

তামাকজনিত ক্ষতি ও রোগে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি নিয়ে বিবৃতি তারা বলেন, টোব্যাকো এটলাসের তথ্য অনুসারে তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর ১ লক্ষ ৯৯ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৬১ হাজার শিশু রোগাক্রান্ত হয়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ব্যয় ছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা যার মধ্যে ৭৩ হাজার কোটি টাকাই তামাকজনিত স্বাস্থ্য ব্যয়। একই সময়ে তামাক থেকে রাজস্ব আয় ছিলো ৪১ হাজার কোটি টাকা যা তামাক ব্যবহারের কারণে হওয়া অর্থনৈতিক ক্ষতির অর্ধেকেরও কম। দেশে তামাক ব্যবহারজনিত রোগের চিকিৎসা খরচ যোগাতে গিয়ে প্রতিবছর দেশের প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মানুষ বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত কল্যাণ-রাষ্ট্রে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। সরকার জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ কে আরো শক্তিশালি করে আইনে পরিণত করবে বলে প্রত্যাশা করেন জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদগণ। এ ক্ষেত্রে আইনে সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি বন্ধ, তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির জন্য আলাদা লাইসেন্স গ্রহণেরমত বিধানগুলো যুক্ত করার দাবী জানান তারা।

বিবৃতিতে মোট ১২ জন অর্থনীতিবিদ স্বাক্ষর করেন। তারা হলেন, অর্থনীতিবীদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. নাজমা বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর পরিচালক ড. মাসুদা ইয়াসমিন, অধ্যাপক ড. রুমানা হক, অধ্যাপক ড. অতনু রব্বানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জাহিদুল কাইয়ুম, সহযোগী অধ্যাপক এসএম আব্দুল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজানা করিম, সহযোগী অধ্যাপক নাজমুল হুসাইন এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেলিনা সিদ্দিকা।