ঢাকাশুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

ক্যান্সার চিকিৎসায় বিপ্লব

সুস্থ কোষের ক্ষতি ছাড়াই টিউমার ধ্বংস করবে ব্যাকটেরিয়া

হাসান মাহমুদ
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬ ১১:১৫ অপরাহ্ণ । ৩৪ জন

ক্যান্সার চিকিৎসায় এক অভাবনীয় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াটারলুর একদল গবেষক এমন এক বিশেষ ‘প্রকৌশলকৃত ব্যাকটেরিয়া’ তৈরি করেছেন, যা শরীরের সুস্থ কোষের কোনো ক্ষতি না করে সরাসরি ক্যান্সার টিউমারের ভেতরে ঢুকে সেটিকে ধ্বংস করতে সক্ষম।

গত বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স ডেইলি’তে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যেখানে ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য, সেখানে এই আবিষ্কার নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

সাধারণত ক্যান্সার টিউমারের কেন্দ্রস্থলে অক্সিজেনের পরিমাণ খুব কম থাকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যানক্সিক জোন’ বলা হয়। প্রচলিত কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন অনেক সময় এই অক্সিজেনহীন গভীর অংশে পৌঁছাতে পারে না, ফলে ক্যান্সার পুরোপুরি নির্মূল হয় না।

গবেষক দল মাটির সাধারণ ব্যাকটেরিয়াকে ‘ক্লোস্ট্রিডিয়াম স্পোরোজেনস’ জেনেটিক্যালি মডিফাই বা পরিবর্তন করেছেন। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেনহীন পরিবেশে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানোর পর এগুলো রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সরাসরি টিউমারের অক্সিজেনহীন অংশে গিয়ে জমা হয় এবং টিউমারটিকে ভেতর থেকে ‘খেতে’ বা ধ্বংস করতে শুরু করে।

এই চিকিৎসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাকটেরিয়াগুলো যেন সুস্থ কোষের ক্ষতি না করে। গবেষক দলের প্রধান ড. মার্ক অকয়েন জানান, তারা ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে একটি বিশেষ ‘জেনেটিক সেফটি সুইচ’ যুক্ত করেছেন। এর ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো যখনই টিউমারের সীমানা পেরিয়ে সুস্থ কোষে (যেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন আছে) প্রবেশ করার চেষ্টা করে, তখনই সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মারা যায়। এতে কেমোথেরাপির মতো ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পদ্ধতিটি মূলত একটি ‘বায়োলজিক্যাল সার্কিট’ বা জৈবিক যন্ত্রের মতো কাজ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়াগুলোর এই মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বর্তমানে এটি প্রাক-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে। সফল হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এটি মানুষের ওপর পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেমোথেরাপির বিকল্প বা সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারবে। কেমোথেরাপির তুলনায় এই ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন ও প্রয়োগ অনেক বেশি সাশ্রয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি কেবল ক্যান্সার কোষকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়, তাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত কম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ‘ব্যাকটেরিয়া থেরাপি’ ক্যান্সার নির্মূলে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি