জাতীয় বাজেট প্রস্তাবে সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ‘তদুর্ধ্ব’ শব্দের কারণে রাজস্ব ফাঁকি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তামাক কোম্পানিগুলো এই শব্দের সুযোগ নিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মতো সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি করে খুচরা শলাকার মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এতে বাড়তি দামে বিক্রি হলেও রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। একইসঙ্গে নথিতে ৪ স্তরের সিগারেট থাকলেও বাজেটে তদুর্ধ্ব শব্দটির কারণে সিগারেটের মূল্য বহুস্তরভিত্তিক হচ্ছে।
বর্তমানে সিগারেটের কর কাঠামো ৪ স্তরভিত্তিক (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতিউচ্চ)। তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ও তামাক বিরোধী জোট দীর্ঘদিন থেকে এ কর কাঠামো ২ স্তরে নিয়ে আসার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু তদুর্ধ্ব শব্দের কারণে কর কাঠামোতে কেবল ৪ ধরনের মূল্যের সিগারেট নয় প্রতি স্তরের ৩ ধরনেরও বেশি মূল্যের সিগারেট বাজারে ছাড়ছে তামাক কোম্পানি।
সরকার চলতি অর্থ বছরে সিগারেটের দাম নির্ধারণ করেছে নিম্ন স্তরে প্রতি ১০ শলাকা ৬০ টাকা, মধ্যম স্তরে প্রতি ১০ শলাকা ৮০ টাকা, উচ্চ স্তরে প্রতি ১০ শলাকা ১৪০ টাকা এবং অতিউচ্চ স্তরে ১৮৫ টাকা। কিন্তু তদুর্ধ্ব শব্দের কারণে বৈধভাবেই তামাক কোম্পানি নিম্ন স্তরে ব্রান্ড ভেদে ৬০ টাকা, ৬৩ টাকা, ৬৫ ও ৭২ টাকা মূল্য নির্ধারণ করেছে। মধ্যম স্তরে ৮০ টাকা, ৮৮, ৯০ ও ১০৮ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৪০ টাকা এবং অতিউচ্চ স্তরে ১৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে।
অর্থাৎ তদুর্ধ্ব শব্দটি না থাকলে চার স্তরে সিগারেটের মূল্য হতো যথাক্রমে ৬ টাকা, ৮ টাকা, ১৪ টাকা ও ১৮.৫ টাকা। কিন্তু তদুর্ধ্ব শব্দটির কারণে বর্তমানে বাজারে আট ধরনের মূল্যের সিগারেট পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো হলো ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১২, ১৫ ও ২০ টাকার। অর্থাৎ তদুর্ধ্ব শব্দের কারণে বাজারে সিগারেট আরও সহজলভ্য হয়েছে। এবং চাইলেই ভোক্তারা সহজেই ব্রান্ড পরির্তন করতে পারে।
তদুর্ধ্ব শব্দের কারণে এমআরপি আইন ভঙ্গ ও ইচ্ছামতো মূল্যে সিগারেট বিক্রি করতে উৎসাহিত হচ্ছে তামাক কোম্পানি
বাংলাদেশে সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশ খুচরা শলাকায় বিক্রি হয়। আর এটাকেই পুঁজি করেই তামাক কোম্পানি দীর্ঘদিন থেকে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। সেটার সত্যতা পেয়ে সরকার এসআরও দিয়ে আইনে সংশোধন এনেছে। কিন্তু তামাক কোম্পানি এমআরপি আইন ভঙ্গ অব্যাহত রেখেছে। যার প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে বাজেট প্রস্তাবে উল্লিখিত ‘তদুর্ধ্ব’ শব্দটি। কারণ এই শব্দের কারণেই বেজড় ও পয়সায় সিগারেটের মূল্য নির্ধারণ করছে তারা। একইসঙ্গে প্রতি শলাকার মূল্য নিজেরাই ঠিক করছে তামাক কোম্পানি। যা প্যাকেটে মুদ্রিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে প্রতি শলাকা সিগারেট বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে ক্রেতারা।
কয়েকটি ব্রান্ডের তথ্য দিয়ে বিষয়টি তুলে ধরা হলো-

গত অর্থবছরে নিম্ন স্তরের কয়েকটি ব্রান্ড ছাড়া অন্যান্য সব স্তরের সিগারেট তদুর্ধ্ব শব্দের সুযোগ নিয়ে সুবিধা অনুযায়ী দাম ঠিক করে তামাক কোম্পানি। ৯ বছর আগে বিএটিবি তাদের রয়েলস সিগারেট দিয়ে তদুর্ধ্ব শব্দের সুযোগ নিয়ে ভিন্ন দামে বাজারে ছাড়ে। সেটা সফলতা পেয়ে গত অর্থবছরে প্রায় সবগুলো সিগারেটের ক্ষেত্রেই তারা একই উপায় অবলম্বন করেছে। তবে চলতি অর্থবছরে সরকার সব স্তরের সিগারেটের কর হার একই করে দেয়ার পর তামাক কোম্পানি মূল্য বৃদ্ধিতে কৌশল অবলম্বন করে অতিউচ্চ স্তর ও উচ্চ স্তরে তদুর্ধ্ব শব্দের সুযোগ নেয়নি। কারণ ইতোমধ্যেই অনেক বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে আসছিলো তারা। তবে আসন্ন অর্থবছরে তদুর্ধ্ব শব্দের অপব্যবহার আরও বাড়বে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আবার নতুন ব্র্যান্ড বাজারে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও তদুর্ধ্ব শব্দের ব্যবহার করে তামাক কোম্পানি। যেমন রয়েলস লন্ডন কাট, লাকি স্টাইক, এরিস, লুকিজ।
ব্যান্ডরোলের অপব্যবহারের সুযোগ
ব্যান্ডরোল বা স্ট্যাম্প গুলো নির্দিষ্ট মূল্যের জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট স্তরের জন্য তৈরি করা হয়। মধ্যম স্তরের সিগারেটে ব্যবহৃত একই ব্যান্ডরোল/স্ট্যাম্প ১৬০ টাকা, ১৭৬ টাকা, ১৮০ টাকা বা ২১৬ টাকার সিগারেটের জন্যও ব্যবহার করা হয়। ফলে কম দামের সিগারেটের জন্য ব্যান্ডরোল/স্ট্যাম্প কিনে বেশি দামের সিগারেটে ব্যবহার করলে সেটা ধরার কোনো উপায় নেই। সব স্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রেই একই পরিস্থিতি।

আবার ব্যান্ডরোল/স্ট্যাম্প যাচাই-বাছাইয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এটি কর ফাঁকির সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়। কারণ একই স্তরের ভিন্ন দামের সিগারেটে একই রঙের ব্যান্ডরোল/স্ট্যাম্প ব্যবহারের ফলে কর ফাঁকির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যেহেতু তামাক কোম্পানি বিভিন্ন উপায়ে কর ফাঁকি দেয়, তাই পুরো বিষয়টি তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
তদুর্ধ্ব শব্দের কারণে মূল্য বৃদ্ধি অনিহা তামাক কোম্পানির
প্রতিবছর সরকার সিগারেটের মূল্য বাড়াতে চাইলেও তামাক কোম্পানি মূল্য বৃদ্ধি না করার জন্য নানা ধরনের কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। কারণ এতে সরকারের রাজস্ব কম আদায় হলেও তামাক কোম্পানি ঠিকই তাদের মুনাফা তুলে নেয়। কারণ যেভাবে বহুস্তরে মূল্য নির্ধারণ এবং নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করা হয় তাতে তামাক কোম্পানির ব্যবসা বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে বাধ্য। আর এসবই সম্ভব হচ্ছে বাজেট প্রস্তাবে তদুর্ধ্ব শব্দের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারের কারণে।
লেখক : ইব্রাহীম খলিল, সিনিয়র প্রজেক্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার, টোব্যাকো ট্যাক্স প্রজেক্ট, অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


