
হৃদ্রোগ বা কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এ ধরনের রোগ প্রতিরোধের প্রচলিত ওষুধের পাশাপাশি এবার মানুষের অন্ত্রে (গাট) প্রাকৃতিকভাবে বসবাসকারী একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া নতুন আশার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা পত্রিকা ‘নেচার’-এ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানবদেহের অন্ত্রে সচরাচর পাওয়া যায় এমন একটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া এক ধরনের অণু তৈরি করে, যা রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল মাত্রা কমাতে এবং ধমনিতে জমে থাকা চর্বির আস্তরণ বা প্লাক সংকুচিত করতে সক্ষম।
এই গবেষণার সহ-লেখক চীনের শেনজেনের সান ইয়াত-সেন ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজিস্ট ওয়েনজিং ঝাও জানান, মানুষের অন্ত্রে থাকা মাইক্রোবায়োমের বিভিন্ন অনুজীব কীভাবে হৃদ্যন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে পারে, এই গবেষণা তারই নতুন পথ উন্মোচন করেছে।
মেলবোর্নের মোনাশ ভিক্টোরিয়ান হার্ট ইনস্টিটিউটের কার্ডিওভাসকুলার বিশেষজ্ঞ বেন চেন এই গবেষণা প্রসঙ্গে বলেন, এটি অত্যন্ত ‘মূল্যবান প্রমাণ যে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ভাসকুলার বা রক্তনালীর স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।’ এটি কেবল হৃদ্রোগ ও মাইক্রোবায়োমের মধ্যকার সরল সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘একটি সম্ভাব্য কার্যকারণ জৈবিক মেকানিজমের জোরালো প্রমাণ’ দেয়।
গবেষণার পটভূমি ও কার্যপদ্ধতি :
অ্যাথেরোস্লেরোসিস (ধমনির দেওয়ালে প্রদাহজনক প্লাক বা চর্বির আস্তরণ জমে যাওয়া) জনিত রোগগুলো বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর প্রধান কারণ। যদিও প্রতিদিন স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মৃত্যুর হার কিছুটা কমেছে, তবুও উন্নত হৃদ্রোগে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক মানুষের ক্ষেত্রে এই ওষুধ একা পর্যাপ্ত পরিমাণে কোলেস্টেরল কমাতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া অনেক রোগীই এই ওষুধের উচ্চ মাত্রা সহ্য করতে পারেন না।
এর একটি বিকল্প খুঁজতে গবেষক ওয়েনজিং ঝাও এবং তার সহকর্মীরা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ও সুস্থ-উভয় শ্রেণির মানুষের মলের নমুনার অন্ত্রের অনুজীব (ফ্লোরা) বিশ্লেষণ করেন। এতে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতি সামনে চলে আসে, যার নাম ব্যাকটেরয়েডস ইউনিফর্মিস। গবেষকরা দেখতে পান যে, সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়াটির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এরপর গবেষকরা ইঁদুরকে জিনগতভাবে পরিবর্তিত করে অ্যাথেরোস্লেরোসিস উপযোগী করে তোলেন এবং হৃদ্রোগীদের অবস্থার অনুকরণে উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ান। বিজ্ঞানীরা যখন ওই ইঁদুরগুলোর শরীরে জীবন্ত ব্যাকটেরয়েডস ইউনিফর্মিস প্রবেশ করান, তখন দেখা যায়-অনুপস্থিত ইঁদুরগুলোর তুলনায় চিকিৎসাপ্রাপ্ত ইঁদুরগুলোর প্রধান ধমনিতে প্লাকের পরিমাণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত কমে গেছে। এই ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা রক্তে মোট কোলেস্টেরল ও লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (খারাপ কোলেস্টেরল) কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি, ইঁদুরের ধমনির দেওয়ালে আক্রমণকারী প্রদাহজনক রোগ প্রতিরোধক কোষের (ইনফ্ল্যামেটরি ইমিউন সেল) পরিমাণও হ্রাস পায়।
যেভাবে কাজ করে ব্যাকটেরিয়াটির তৈরি অণু :
গবেষক দল এই সুরক্ষার পেছনের মূল অনুটিকে আলাদা করতে সক্ষম হন, যার নাম পেন্টাডেকানোয়িক অ্যাসিড। পরবর্তীতে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অণু লিভারের এমন একটি এনজাইমকে বাধা দেয় যা কোলেস্টেরল উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধও ঠিক একই এনজাইমকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। এই এনজাইম অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে লিভার উদ্দীপ্ত হয়ে রক্তপ্রবাহ থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল টেনে বের করতে আরও বেশি এলডিএল রিসেপ্টর তৈরি করে।
মানুষের ওপর এর প্রভাব যাচাই করতে গবেষক দল ২০০ জনেরও বেশি মানবদাতার রক্ত ও মলের নমুনা পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মতো চর্বিযুক্ত অণুর ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি, সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় তাদের শরীরে পেন্টাডেকানোয়িক অ্যাসিডের মাত্রা কম রয়েছে। মল বিশ্লেষণেও দেখা গেছে যে, নিয়ন্ত্রণ দলের (কন্ট্রোল গ্রুপ) মানুষের তুলনায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে এই অণু উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াল জিনের পরিমাণ কম ছিল।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা :
মানুষের ওপর পরিচালিত প্রাথমিক নমুনায় দেখা গেছে, যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, তাদের শরীরে পেন্টাডেকানোয়িক অ্যাসিড এবং এই অণু প্রস্তুতকারী ব্যাকটেরিয়াল জিনের পরিমাণও কম থাকে।
তবে গবেষকরা এখনই অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার পক্ষে নন। সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োম বিশেষজ্ঞ কাজুয়ুকি কাসাহারা মনে করেন, এটি একটি চমৎকার ধারণার প্রমাণ, তবে মানবদেহের জটিল ইকোসিস্টেমে এর কার্যকারিতা যাচাই করতে আরও দীর্ঘমেয়াদী ও বড় পরিসরে মানব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন। এছাড়া ইঁদুরের শরীরে যে মাত্রায় ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করা হয়েছে, তা সাধারণ খাবার বা সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে মানুষের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
তারপরেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের এই ক্ষমতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে হৃদ্রোগ চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।