
প্রসবপরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (পিপিএইচ) রোধ ও মাতৃমৃত্যু কমাতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) উদ্ভাবিত সহজলভ্য ‘কিউ-ম্যাট’ এবার নাইজেরিয়ায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে তৈরি একটি সফল স্বাস্থ্য উদ্ভাবন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল এবং বিশ্বজুড়ে মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, প্রসবপরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বিশ্বজুড়ে প্রসূতি মৃত্যুর অন্যতম প্রধান অথচ প্রতিরোধযোগ্য কারণ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের (কম সুযোগ-সুবিধা) দেশগুলোতে এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট। পরিসংখ্যান বলছে, পিপিএইচজনিত কারণে সংঘটিত মোট মাতৃমৃত্যুর ৮০ শতাংশের বেশি ঘটে সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। যেখানে উন্নত ল্যাব বা আধুনিক মনিটরিং যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে, সেখানে রক্তক্ষরণের সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সংকট নিরসনে ২০০৬ সালে বাংলাদেশে একটি যুগান্তকারী ও সাশ্রয়ী সমাধান নিয়ে আসেন গবেষকরা। আইসিডিডিআর,বি-র তৎকালীন গবেষক ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে উদ্ভাবিত হয় এই ‘কিউ-ম্যাট’। এটি মূলত একটি সহজ, স্বল্পমূল্যের এবং পচনশীল (বায়োডিগ্রেডেবল) প্রসব মাদুর, যা প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দ্রুত শনাক্ত করতে বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে। মাদুরটির বিশেষ গঠনশৈলীর কারণে এটি সম্পূর্ণ ভিজে গেলে প্রায় ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত ধারণ করতে পারে। এটি একটি স্পষ্ট দৃশ্যমান সতর্কবার্তা (ভিজ্যুয়াল সিগন্যাল) হিসেবে কাজ করে, যা উপস্থিত স্বাস্থ্যকর্মীদের অবিলম্বে সতর্ক করে। এর ফলে সীমিত সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত (প্রত্যন্ত অঞ্চল) রোগীকে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা দেওয়া কিংবা উন্নত হাসপাতালে রেফার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
বাংলাদেশে এই মাদুরের সফল ব্যবহারের পর এর সুফল এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায়, আইসিডিডিআর,বি নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কিউ-ম্যাট অভিযোজন ও বাস্তবায়নের জন্য দেশটির বায়েরো ইউনিভার্সিটির ‘আফ্রিকা সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর পপুলেশন হেলথ অ্যান্ড পলিসি’ (এসিইপিএইচএপি)-এর সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এই অংশীদারত্বকে সামনে এগিয়ে নিতে এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে গত সোমবার ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত আইসিডিডিআর,বি কার্যালয়ে একটি বিশেষ প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সেশনের আয়োজন করা হয়। ‘ইন্টিগ্রেটিং আইসিডিডিআর,বি কিউ-ম্যাট ইন ম্যাটারনাল হেলথ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপিজ) অ্যান্ড লার্নিং ফ্রম দ্য ডেমনস্ট্রেশন ইন সিলেক্টেড পাবলিক হেলথ সেটিংস’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই সেশনটি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশিক্ষণ ও আলোচনা সেশনে নাইজেরিয়ার পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন- আমিনা কানো টিচিং হসপিটালের কনসালট্যান্ট অবস্টেট্রিশিয়ান অ্যান্ড গাইনোকলজিস্ট অধ্যাপক আয়ুবা রাবিউ এবং বায়েরো ইউনিভার্সিটি কানোর এসিইএইচএপি-এর রিসার্চ ফেলো ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. আমিনু আদো ওয়াকিলি।
প্রশিক্ষণ সেশনে কিউ-ম্যাটের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া, বাংলাদেশে এর কার্যকারিতার বাস্তব প্রমাণ, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, নাইজেরিয়ার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে এর উপযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। নাইজেরিয়ার প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এই উদ্ভাবনের কার্যকারিতা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন এবং তাদের দেশের মাতৃমৃত্যু হ্রাসে এটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসবকালীন জটিলতা মোকাবিলায় উচ্চ প্রযুক্তির ওপর সবসময় নির্ভর করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর গ্রামীণ পর্যায়ে জীবন রক্ষায় এমন সহজলভ্য ও স্থানীয় প্রযুক্তির বিকল্প নেই। বাংলাদেশে উদ্ভাবিত কিউ-ম্যাটের এই আন্তর্জাতিক বিস্তার প্রমাণ করে যে সঠিক ও সময়োপযোগী চিকিৎসা উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে মানবকল্যাণে বিরাট পরিবর্তন আনতে পারে। এই অংশীদারত্ব বাস্তবায়িত হলে নাইজেরিয়ার কম সম্পদযুক্ত অঞ্চলে প্রসবপরবর্তী রক্তক্ষরণ দ্রুত শনাক্তকরণের মাধ্যমে বহু মায়ের মূল্যবান জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।