
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে চলতি বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, যুদ্ধ না হলে ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে আনুমানিক ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং মানুষের আয় না বাড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে যথেষ্ট পৌঁছায়নি। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করেছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়া, গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সার উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে পরিবহন, কৃষি, পণ্যের দাম ও মানুষের আয়-রোজগারে। সংকট দীর্ঘ হলে দেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতিও আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে ভোক্তাদের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। এতে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয় নিয়ে চাপ বেড়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে শিল্প ও সার উৎপাদনেও। দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিকে গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এরই মধ্যে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বিশ্বব্যাংকের।
এর প্রভাব কৃষি খাতেও পড়তে পারে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সার ও কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন ছোট কৃষকরা।
অন্যদিকে জ্বালানির বাড়তি দামে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। এতে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়তে শুরু করেছে। গ্যাস সংকটে কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনাগুলো পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে।
সব মিলিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির ধীরগতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমানোর সম্ভাবনাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে জ্বালানি, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানে চাপ আরও বাড়বে এবং এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।