
পানিবাহিত রোগ কলেরা প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানায় বিনামূল্যে মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা দেওয়া হচ্ছে। ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় দুই ডোজের এই টিকা পাচ্ছেন ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন টিকাদান কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে এসে টিকা গ্রহণ করছেন।
লালবাগ দোতলা মসজিদ এলাকা থেকে চার বছর বয়সী মেয়ে নওরিন আক্তার জুঁইকে কলেরা টিকা খাওয়াতে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন তার মা ফাতেমা আক্তার। তিনি বলেন, মেয়ের মাঝেমধ্যেই পেটের সমস্যা হতো। হাত ধোয়া, ভালো পানি দিয়ে রান্না করা এবং পানি ফুটিয়ে খাওয়ানোর পরও সমস্যা পুরোপুরি কমেনি। বিনামূল্যে কলেরা টিকা দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
আজিমপুর সরকারি কলোনি থেকে দুই বছরের ছেলে অর্ণব সরকারকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে আসেন পলি সরকার। তিনি জানান, ছেলেটির সারা বছরই শরীর খারাপ থাকে এবং পেটের সমস্যাও রয়েছে। প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে, আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ডোজ খাওয়াবেন বলে জানান তিনি।
আজিমপুরের টিকাকেন্দ্রে কর্মী তাহমিনা আক্তার বলেন, সকাল থেকেই টিকাদান কার্যক্রম চলছে। এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে নাম নিবন্ধন করে টিকা নিচ্ছেন। প্রথম ডোজ নেওয়ার এক মাস পর দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের জন্য তাদের জানানো হচ্ছে এবং টিকা কার্ডে বিষয়টি লিখে দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ডোজ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে। গর্ভবতী নারী ছাড়া এক বছর বা তার বেশি বয়সী সব নাগরিককে ইউরিকল প্লাস নামের এই টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
কর্মসূচির আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও, মুন্সিগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল, নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর এলাকায়ও কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ সহযোগিতায় ২২ আগস্ট থেকে প্রথম ধাপের টিকাদান শুরু হয়েছে। এর আগে ২০ আগস্ট কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে টিকাদানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন টিকাকেন্দ্রে দেখা যায়, কর্মীদের কেউ নাম নিবন্ধন করছেন, কেউ অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করছেন এবং রেজিস্ট্রেশন শেষে অন্য কর্মী টিকা খাওয়াচ্ছেন। পাশাপাশি প্রচারকর্মীরা আশপাশের এলাকায় গিয়ে মানুষকে টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করছেন এবং এর উপকারিতা সম্পর্কে জানাচ্ছেন।
তেজগাঁও এলাকার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে দুই সন্তানকে টিকা খাওয়াতে আসেন আজিজুর রহমান। সাত বছর ও সাড়ে তিন বছর বয়সী দুই সন্তানকে প্রথম ডোজ খাওয়ানোর পর তিনি বলেন, ডেঙ্গু ও হাম নিয়ে এমনিতেই আতঙ্কে আছেন। এর মধ্যে ডায়রিয়া শুরু হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতো। দুই সন্তানকে টিকা দিতে পেরে তার ভয় অনেকটাই কমেছে।
অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, বর্তমানে ১৪টি উপজেলায় প্রথম ধাপে টিকাদান চলছে। পরে ধাপে ধাপে উচ্চঝুঁকিতে থাকা মোট ১৪৪টি উপজেলায় এই টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দুই ডোজের এই টিকা তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ মারা যান। বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ এখনো এ রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা।
এদিকে আইসিডিডিআর,বি ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নথিবদ্ধ কলেরা রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১৪১ জন। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা কমে আসে। তবে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকায় কলেরা আক্রান্তের সংখ্যা আবারও বাড়তে শুরু করে।