
দেশে টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে তরুণ প্রজন্ম এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে চলমান হাম-রুবেলা প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ইপিআই, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে “বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে তরুণ প্রজন্ম এবং অংশীজনদের সমন্বিত কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় এবং ২০২৬ সালের হামের প্রকোপ মোকাবেলা শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। সভাটির আয়োজন করে ইপিআই, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন।

উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, এ. টি. এম. সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব, জনস্বাস্থ্য শাখা, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব মোঃ মহসীন, মহাপরিচালক, অটিজম সেল, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ডাঃ রিয়াদ মাহমুদ, হেল্থ ম্যানেজার-ইমুনাইজেশন, ইউনিসেফ বাংলাদেশ, ডাঃ সুধির যোশি, টিম লিড, আইভিডি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ডাঃ রাজীব সরকার, মেডিকেল অফিসার, ইপিআই অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স, স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তর। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাঃ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন ও চেয়ার, গ্যাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটি। এছাড়া আরও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, যুব সংস্থার প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকার টিকাদান কর্মসূচীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণে টিকাদান কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যপি স্বীকৃত। টিকা দিয়ে প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমে শিশু ও নারীদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব রোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই সাফল্য ধরে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমকে অধিকতর গতিশীল করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ সরকারের টিকা কর্মসূচির মাধ্যমে ইতিমধ্যে পোলিও ও ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল, হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ, এবং সম্প্রতি ৯৩ শতাংশ এইচপিভি (HPV) টিকা ও ৯৭ শতাংশ টিসিভি (TCV) টিকা কভারেজ অর্জিত হয়েছে। ইপিআই কার্যক্রমের মাধ্যমে ৯টি এন্টিজেন, ১২টি রোগের (যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি, নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া, পোলিও মাইলাইটস, হাম, রুবেলা ও টিটানাস) টিকা প্রদান করা হয়। বর্তমানে জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য এইচপিভি (HPV) এবং টিসিভি (TCV) যুক্ত হয়েছে।
২০২৬ সালের চলমান হাম-রুবেলা প্রাদুর্ভাব টিকাদান কভারেজের ঘাটতি, মিসড-কোহর্ট, নগর ও দুর্গম এলাকার সেবা-অপ্রতুলতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপের বিষয়টি নতুনভাবে সামনে এনেছে। DGHS-উদ্ধৃত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২৯,৫৪৯ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী, ৪,২৩১ জন ল্যাব-নিশ্চিত হাম রোগী, ১৯৮ জন সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Disease Outbreak News অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায়, অর্থাৎ আটটি বিভাগে, হাম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং WHO জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী আক্রান্তদের বড় অংশ শিশু; পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি, এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৫-০৩-২০২৬ থেকে ২৬-০৪-২০২৬ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৩২,০২৮, নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৪,৬০৩ এবং মোট সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ২১৬। তথ্য অনুসারে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ৯ মাসের কম বয়সী, ৮৩ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী, এবং ৯১ শতাংশ ১–১৪ বছর বয়সী শিশু। টিকাদান প্রোফাইল বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে ৭২ শতাংশ জিরো-ডোজ এবং ১৬ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত, যা জনসংখ্যাগত ইমিউনিটি গ্যাপের গভীরতা নির্দেশ করে।
গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে ৬–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে জরুরি MR টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৮টি অগ্রাধিকার জেলার ৩০টি উপজেলায় কার্যক্রম শুরু হয়; প্রায় ১২ লাখের বেশি শিশুকে লক্ষ্যভুক্ত করে এ ক্যাম্পেইন পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া, ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী MR ক্যাম্পেইনও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি Rapid Response Team সক্রিয়করণ, হাম চিকিৎসা কর্নার ও আইসোলেশন রুম স্থাপন, নজরদারি জোরদারকরণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।
হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুধু জরুরি ক্যাম্পেইন যথেষ্ট নয়; নিয়মিত টিকাদান সেবা পুনরুদ্ধার, দুই ডোজ MR কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা, মিসড-কোহর্ট চিহ্নিতকরণ, ভ্যাকসিন ও কোল্ড চেইন সরবরাহ নিশ্চিত করা, নজরদারি ও কেস ম্যানেজমেন্ট জোরদার করা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। যুবসমাজকে কমিউনিটি মোবিলাইজেশন, টিকাদান বিষয়ে আস্থা তৈরি, গুজব প্রতিরোধ এবং পরিবার পর্যায়ে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও স্থিতিস্থাপক করতে সরকারের উচিত অবিলম্বে ইপিআই কর্মসূচির শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নিজস্ব টিকাদান কর্মী নিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ ও বিতরণ দ্রুত নিশ্চিতকরণ, সরকারি বাজেটের আওতায় ভ্যাকসিন সরবরাহ ও কোল্ড চেইন রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্গম ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টিকাদান উদ্যোগ, লক্ষ্যভিত্তিক যোগাযোগ কার্যক্রম এবং EPI/MIS/DGHS-এর ডিজিটাল উদ্ভাবন—E-Tracker, VaxEPI, eVLMIS ও GIS-ভিত্তিক অনলাইন মাইক্রোপ্ল্যানিং—সম্প্রসারণ ও টেকসই বাস্তবায়ন করা।
অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে পারলে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে এবং সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব মকাবেলাতেও কার্যকর ভুমিকা রাখা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক প্রেজেন্টেশান তুলে ধরেন ডাঃ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন ও চেয়ার, গ্যাভি সিএসও স্টিয়ারিং কমিটি এবং ডাঃ ফারহানা রহমান, হেল্থ অফিসার, ইউনিসেফ বাংলাদেশ । এছাড়াও বেসরকারি সংস্থা প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ, একাডেমিক গবেষক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন, ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন পরিচালিত প্রকল্পের পলিসি অ্যাডভাইজার অধ্যাপক ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম।