বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ বাস্তুসংস্থান আমাজনসহ ক্রান্তীয় অঞ্চলের পতঙ্গরা এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না প্রায় ২ হাজার ৩০০ প্রজাতির পতঙ্গ, যা মানবসভ্যতার খাদ্য শৃঙ্খলকে তছনছ করে দিতে পারে।
জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব উর্জবার্গ এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রেমেনের গবেষকরা আমাজন এবং পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়ার সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের প্রায় ২ হাজার ৩০০ প্রজাতির (৮,০০০-এর বেশি নমুনা) পতঙ্গের ওপর এই নিবিড় গবেষণা চালিয়েছেন। গবেষণার প্রধান ফলাফলগুলো হলো-
জেনেটিক সীমাবদ্ধতা: বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, পতঙ্গদের উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা তাদের প্রোটিন গঠনের (প্রোটিন আর্কিটেকচার) ওপর নির্ভর করে। এই গঠন পরিবর্তন হতে হাজার হাজার বছর সময় লাগে। ফলে বর্তমানের দ্রুতগতির জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না।
হিট কোমা: গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে পতঙ্গরা তাদের স্নায়বিক ও পেশিবহুল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘হিট কোমা’। এই অবস্থায় পতঙ্গরা নড়াচড়া বা খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না, যা শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
নিম্নভূমির ঝুঁকি: আমাজনের মতো নিচু এলাকার পতঙ্গদের পালানোর কোনো জায়গা নেই। ফলে ২ হাজার ১০০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের প্রায় ৫০ শতাংশ পতঙ্গ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান ও নিচু ভূমির দেশের জন্য এই খবর এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। এখানকার আম, লিচু ও ধান চাষের জন্য যে মৌমাছি ও উপকারী পতঙ্গরা অপরিহার্য, তীব্র দাবদাহে তারাও আজ অস্তিত্ব সংকটে। এই অদৃশ্য প্রাণীদের বিলুপ্তি কেবল জীববৈচিত্র্য নয়, বরং সরাসরি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। মহাকাশ থেকে ধরা পড়া দেশের আকাশে মিথেন কুন্ডলী যখন তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, তখন মাঠপর্যায়ে এই পতঙ্গ বিলুপ্তি আমাদের এক নীরব দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
পরাগায়ন ও ফসলের ক্ষতি: বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ও ফল যেমন—আম, লিচু, সরিষা এবং বিভিন্ন শীতকালীন সবজি মৌমাছি ও ভ্রমরের পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা অনুযায়ী, তাপমাত্রা বাড়লে যদি এই উপকারী পতঙ্গরা ‘হিট কোমা’য় চলে যায়, তবে ফসলের ফলন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ তাপমাত্রায় আম ও লিচুর পরাগায়নকারী প্রাকৃতিক পতঙ্গের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।
ক্ষতিকর পতঙ্গের আধিপত্য: গবেষণায় দেখা গেছে, সব পতঙ্গ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে উপকারী পতঙ্গরা মারা গেলেও ক্ষতিকর পতঙ্গ (যেমন ধানের মাজরা পোকা বা লেদা পোকা) উচ্চ তাপমাত্রায় আরও দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এটি বাংলাদেশের ধান চাষের জন্য দ্বিগুণ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, তীব্র দাবদাহের সময় ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হয়, যার অন্যতম কারণ হলো এই সময়ে উপকারী পতঙ্গদের অনুপস্থিতি।
সুন্দরবনের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য: সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনে অসংখ্য নাম না জানা পতঙ্গ রয়েছে যা বনের পুনর্জন্ম ও খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা করে। ক্রমাগত দাবদাহের কারণে এই পতঙ্গরা হারিয়ে গেলে পুরো ম্যানগ্রোভ বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।
মৌয়ালদের বরাত দিয়ে বন কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তীব্র গরমে সুন্দরবনে প্রাকৃতিক মৌচাক থেকে মধু উৎপাদনের পরিমাণ আগের তুলনায় হ্রাস পাচ্ছে, যার পেছনে তাপমাত্রার বড় ভূমিকা রয়েছে।
শহুরে হিট আইল্যান্ড প্রভাব: ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবের কারণে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। ফলে শহর এলাকা থেকে মৌমাছি বা প্রজাপতির মতো পতঙ্গরা দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
গবেষণার প্রধান লেখক উর্জবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ফিলিপ জানজেন বলেন, ‘আমরা সাধারণত মনে করি প্রাণীরা তাপমাত্রা বাড়লে শীতল কোনো জায়গায় চলে যাবে। কিন্তু আমাজন বা কেনিয়ার সমতল অঞ্চলের পতঙ্গদের যাওয়ার মতো কোনো উঁচু বা শীতল জায়গা নেই। তাদের পালানোর পথ বন্ধ। এই পতঙ্গরা যদি তাদের প্রোটিন কাঠামো বা ‘প্রোটিন আর্কিটেকচার’ দ্রুত পরিবর্তন করতে না পারে, তবে আমাদের চোখের সামনেই তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’
সহ-গবেষক, ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ক্রিশ্চিয়ান কফ বলেন, পতঙ্গদের ‘হিট কোমা’ বা তাপীয় জড়তা একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়। তাপমাত্রা যখন তাদের সহ্যক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তারা নড়াচড়া বা খাবার গ্রহণ করতে পারে না। এটি একটি নীরব মৃত্যুফাঁদ, যা আমাদের অজান্তেই হাজার হাজার প্রজাতির পতঙ্গকে মুছে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের কীটতত্ত্ববিদদের মতে, গত কয়েক বছরের তীব্র হিটওয়েভের সময় ফসলের মাঠে পরাগায়নকারী পতঙ্গের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সৈয়দ নুরুল আলম গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাপমাত্রা যখন ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ওঠে, তখন মৌমাছিরা তাদের ওড়ার ক্ষমতা হারায়। তারা ‘অ্যালট্রিউস্টিক’ আচরণ শুরু করে, অর্থাৎ নিজেদের ঠান্ডা রাখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফলে পরাগায়ন বন্ধ হয়ে যায়।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনায় উল্লেখ করেছেন, তীব্র দাবদাহে উপকারী পোকামাকড় যেমন লেডিবার্ড বিটল বা সিরফিড ফ্লাই-এর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কিন্তু উল্টোদিকে ক্ষতিকর পোকাদের প্রজনন ক্ষমতা বাড়ছে।
গবেষণাটি কেবল সতর্কই করেনি, বরং বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু কার্যকর ও টেকসই সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছেন। যেমন- ফসলের মাঠের চারপাশে ও শহরে ছায়াযুক্ত গাছ লাগানো, যা পতঙ্গদের জন্য ‘তাপীয় আশ্রয়স্থল’ হিসেবে কাজ করবে। তাপমাত্রার চাপে থাকা পতঙ্গদের ওপর রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে তাদের টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া এবং বৈশ্বিক ও স্থানীয় পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।


