এক সময় দ্বিতীয় নাগরিকত্ব বা অন্য দেশের পাসপোর্ট কেবল শখের বিষয় থাকলেও, ২০২৬ সালে এসে এটি একটি শক্তিশালী জীবনমুখী কৌশলে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে বিশ্বের অসংখ্য মানুষ এখন একটি ‘ব্যাকআপ প্ল্যান’ বা বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজ করছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৪ লক্ষ মার্কিন নাগরিক দেশের বাইরে বসবাস করছেন, যা ২০১০ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। কেবল ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা নয়, বরং ভ্রমণের স্বাধীনতা, ট্যাক্স সাশ্রয় এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য। তবে নিরাপত্তা যাচাই ও খরচের কড়াকড়ি বেড়ে যাওয়ায় ‘সস্তায় পাসপোর্ট’ পাওয়ার দিন এখন শেষ। বর্তমানে কোন দেশগুলো বিনিয়োগের বিনিময়ে সবচেয়ে সহজে নাগরিকত্ব দিচ্ছে, তা দেখে নেওয়া যাক।
সহজে নাগরিকত্ব দিচ্ছে যে ১০ দেশ
১. মিশর (Egypt): বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী নাগরিকত্ব প্রোগ্রাম দিচ্ছে মিশর। মাত্র ১,০০,০০০ ডলার অনুদান দিয়ে এই দেশের পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। এছাড়া ৫,০০,০০০ ডলার ব্যাংকে তিন বছরের জন্য আমানত রেখেও নাগরিক হওয়া যায়।
২. ভানুয়াতু (Vanuatu): দ্রুততম সময়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ভানুয়াতু অতুলনীয়। মাত্র ১,৩০,০০০ ডলার বিনিয়োগ করে এই দেশের পাসপোর্ট পাওয়া যায়। গতির দিক থেকে এটি এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা পছন্দ।
৩. ডোমিনিকা (Dominica): ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই দেশে নাগরিকত্ব পেতে খরচ শুরু হয় ২,০০,০০০ ডলার থেকে। এই প্রোগ্রামের বড় সুবিধা হলো এখানে নাগরিক হওয়ার জন্য দেশটিতে সশরীরে উপস্থিত থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
৪. অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা (Antigua & Barbuda): পারিবারিক আবেদনের জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। ২,৩০,০০০ ডলার অনুদান বা ৩,০০,০০০ ডলারের রিয়েল এস্টেট ক্রয়ের মাধ্যমে এখানে নাগরিক হওয়া যায়। শর্ত হিসেবে প্রথম ৫ বছরের মধ্যে মাত্র ৫ দিন সেখানে অবস্থান করলেই চলে।
৫. গ্রেনাডা (Grenada): কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের জন্য গ্রেনাডা সেরা পছন্দ। ২,৩৫,০০০ ডলার খরচ করে এই দেশের নাগরিক হলে যুক্তরাষ্ট্রের E-2 ইনভেস্টর ভিসার জন্য আবেদন করার বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়।
৬. সেন্ট লুসিয়া (Saint Lucia): কোনো শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই নাগরিকত্ব দেয় সেন্ট লুসিয়া। এখানে ২,৪০,০০০ ডলার অনুদান অথবা ৩,০০,০০০ ডলারের প্রপার্টি কিনলেই পাসপোর্ট মিলছে।
৭. সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস (St. Kitts & Nevis): ১৯৮৪ সালে চালু হওয়া বিশ্বের প্রথম আধুনিক সিটিজেনশিপ প্রোগ্রাম এটি। ২০২৬ সালে এখানে নাগরিকত্ব পেতে ২,৫০,০০০ ডলার অনুদান অথবা ৩,২৫,০০০ ডলারের রিয়েল এস্টেট কেনা প্রয়োজন।
৮. তুরস্ক (Turkey): যাঁরা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের জন্য তুরস্ক সেরা। ৪,০০,০০০ ডলারের সম্পত্তি কিনে ৩ বছর ধরে রাখলেই মিলছে তুরস্কের পাসপোর্ট। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর পাসপোর্টের চাহিদা ব্যাপক।
৯. নর্থ মেসিডোনিয়া (North Macedonia): ইউরোপীয় অঞ্চলের নাগরিকত্ব চাইলে এটি একটি সাশ্রয়ী বিকল্প। সরকারি অনুমোদিত প্রকল্পে প্রায় ২,০০,০০০ ইউরো বিনিয়োগের মাধ্যমে এখানে আবেদন করা যায়। এটি ইউরোপে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য চমৎকার সুযোগ।
১০. কম্বোডিয়া (Cambodia): এশিয়ায় দ্বিতীয় নাগরিকত্ব খুঁজলে কম্বোডিয়া হতে পারে অন্যতম গন্তব্য। এখানে প্রায় ২,৪৫,০০০ ডলার অনুদান বা অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব।
বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বা ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট’ কেবল একটি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা। যদিও এই পাসপোর্টগুলো আপনাকে ভিসা-মুক্ত চলাফেরা বা আর্থিক বৈচিত্র্যের সুযোগ দেয়, তবে মনে রাখা প্রয়োজন এটি আপনাকে মূল দেশের কর (Tax) বাধ্যবাধকতা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি দেয় না।
২০২৬ সালের এই পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজের ও পরিবারের জন্য একটি ‘প্ল্যান-বি’ রাখা এখন সময়ের দাবি। তবে যেকোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেই দেশের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং আইনি জটিলতাগুলো একজন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।


