ঢাকাসোমবার , ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা তীব্রতর: কৃষি, কৃষক ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬ ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ । ৬১ জন

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ক্রমেই গভীর সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে খরার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা ফসল উৎপাদন, পানিসম্পদ এবং কৃষকের জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ক্রমাগত চাপে পড়ছে।

২০১২ সালের পর বদলেছে খরার চরিত্র

গবেষণা ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের পর থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রকৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। ওই সময় থেকে বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কমতে থাকে এবং শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মাঝারি মাত্রার খরা নিয়মিত দেখা গেলেও ২০১৬ সালের পর তা আরও স্পষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। ২০১৯ সালের পর থেকে একাধিক বছর টানা শুষ্ক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ভেঙে দিয়েছে।

উৎপাদন কমছে, ব্যয় বাড়ছে

জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে গড়ে ১২ থেকে ২৩ লাখ হেক্টর জমি কোনো না কোনো মাত্রার খরার প্রভাবে পড়ে। এর বড় অংশ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এই অঞ্চলে ধানসহ প্রধান ফসলের উৎপাদন মৌসুমভেদে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমন ধানে ফুল আসার সময় পানির ঘাটতির কারণে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে সেচের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

সংকটের কেন্দ্রে পানিসম্পদ

২০১২ সালের পর থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নামছে। অনেক এলাকায় যেখানে আগে অল্প গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, সেখানে এখন কয়েক মিটার গভীরে নলকূপ স্থাপন করতে হচ্ছে। এতে গভীর নলকূপের সংখ্যা বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ কৃষকদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদী, খাল ও জলাশয়ে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক সেচব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।

কৃষকের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব

খরার প্রভাব কৃষকের জীবনে সরাসরি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ফসল উৎপাদনে খরচ বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন কমছে। ফলে আয় হ্রাস পাচ্ছে এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১২ সালের পর থেকে এই অঞ্চলে কৃষিনির্ভর পরিবারের গড় আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। একই সঙ্গে খরা-আক্রান্ত এলাকায় মৌসুমি কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় অনেক মানুষ অন্য অঞ্চলে কাজের সন্ধানে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

মৌসুমি সমস্যা নয়, কাঠামোগত সংকট

গবেষকদের মতে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরা এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে। শুধু বৃষ্টিপাতের তথ্য দিয়ে খরার প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও পানির প্রাপ্যতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে খরার তীব্রতা ও বিস্তার আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১২ সালের পর থেকে এই সূচকগুলোর সম্মিলিত পরিবর্তন এ অঞ্চলে খরার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা

কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম ভরকেন্দ্র। এ অঞ্চলে ধান উৎপাদন কমে গেলে জাতীয় খাদ্য মজুদ ও বাজার ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চালের দাম অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

গবেষণা ও নীতিগত সহায়তার ওপর জোর

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির মহাসচিব ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর এএসএম গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, আবহাওয়াজনিত পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরেই চলমান। ফলে কৃষি খাতকে শুধুমাত্র সরকারের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে রাখা যাবে না। সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এজন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, অনুকূল নয় বা লবণাক্ত জমির জন্য সহনশীল ফসল ও প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে কৃষিজমি অবক্ষয় রোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই সংকটের মধ্যে সরকার হঠাৎ কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সরকারের ভূমিকা হবে কৃষকদের প্রণোদনা ও সহায়তা দেওয়া এবং সহায়ক নীতিমালা গড়ে তুলে কৃষিকে টিকিয়ে রাখা।