জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উত্তম পদ্ধতি হলো কর বৃদ্ধি। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হলো স্পেসিফিক ট্যাক্স বা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা। কারণ, এড ভ্যালোরেম কর ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদক কোম্পানি অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করতে পারে। বাংলাদেশেও বহু বছর ধরে এড ভ্যালোরেম সিস্টেমে কর ও মূল্য বৃদ্ধির কারণে সিগারেট কোম্পানিগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে।
এড ভ্যালোরেম কর কাঠামোর দুর্বলতা
বাংলাদেশে সিগারেটের বাজারের ৭৫ শতাংশই দখল করে আছে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ। উদাহরণস্বরূপ, বিএটি বাংলাদেশের এর নিট মুনাফা প্রায় ৭ গুণ বেড়েছে ১৪ বছরে। বিপরীতে ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিগারেটের উৎপাদন আড়াই গুণ বেড়েছে। বিএটি বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালে কোম্পানিটি ২,৬৪৪ কোটি শলাকা উৎপাদনের বিপরীতে নিট মুনাফা করেছিল ২৫৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৬,৭৯৭ কোটি শলাকা এবং নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়ায় ১,৭৫১ কোটি টাকা। আড়াই গুণ উৎপাদন বৃ্দ্ধি করে প্রায় ৭ গুণ মুনাফা করতে পারার প্রধান কারণ হলো বিদ্যমান এড ভ্যালোরেম কর কাঠামোর দুর্বলতা।শুধু বিএটি নয়, জাপান টোব্যাকো এবং দেশীয় সিগারেট কোম্পানিগুলোর একইভাবে মুনাফা করে আসছে।

সিগারেটের কর কাঠামোয় যুগান্তকারী পরিবর্তন করেছে মেক্সিকো:
সিগারেটসহ উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিসম্পন্ন পণ্যের ব্যবহার কমানো এবং এসব পণ্যের ব্যবহারজনিত ক্ষতি বিশেস করে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যক্ষতির পেছনে চিকিৎসার জন্য সরকারি অর্থায়ন জোরদার করা। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে মেক্সিকো সরকার সিগারেট ও চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য সুনির্দিষ্ট কর বৃদ্ধি কার্যকর করেছে।
মেক্সিকো সরকারের এই কর সংস্কারের আওতায় ২০২৬ সাল থেকে তামাকজাত পণ্যের কর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। সিগারেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য IEPS (তামাকজাত পণ্যের আবগারি কর)-এর অ্যাড ভ্যালোরেম হার খুচরা মূল্যের ১৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে চূড়ান্ত দামে করের অংশ বড় আকারে বৃদ্ধি পাবে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পাঠানো নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ব্র্যান্ড ও প্যাকেটের সিগারেটের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে প্রতি প্যাকেটের দাম ১৫ থেকে ২২ পেসো পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। ব্র্যান্ড ও প্যাকেটে সিগারেটের সংখ্যা অনুসারে প্রতি প্যাকেটের দাম বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ১০০-১৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। (১ মেক্সিকান পেসো=৬.৮ টাকা ধরে) হাতে তৈরি সিগার ও অন্যান্য হাতে তৈরি তামাকপণ্যের ক্ষেত্রে করের হার ৩০.৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতি সিগারেটের ওপর ০.৮৫১৬ মেক্সিকান পেসো হারে নির্দিষ্ট কর আরোপ করা হবে। প্রতি সিগারেটের ওপর নির্দিষ্ট কর ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। এই হিসাব অনুযায়ী, কেবল নির্দিষ্ট IEPS কর হিসেবেই ২০ শলাকার একটি সিগারেট প্যাকেটে ২০২৬ সালে বাড়বে প্রায় ১৭ পেসো, যা ২০২৯ সালে বেড়ে ২১ পেসোর বেশি হবে। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৳১১৬ থেকে ৳১৪৬, যা খুচরা দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
কত টাকা বাড়বে ২০ শলাকার প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্রতি প্যাকেট:

মেক্সিকোতে বর্তমানে ২০ শলাকার Marlboro সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের মূল্য ৮২ পেসো। কর বৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই দাম বৃদ্ধি পেয়ে ১০৫ পেসো হবে। বাংলাদেশি টাকায় ৫৫৮ টাকা থেকে বেড়ে হবে ৭০০ থেকে ৭২০ টাকা পর্যন্ত।
Marlboro: বর্তমানে ২০ শলাকার প্যাকেটেরর দাম ৮২ মেক্সিকান পেসো, যা কর বৃদ্ধির পরে হবে ১০৫ পেসো । আর বাংলাদেশি টাকায় বর্তমান মূল্য ৫৫৮ টাকা থেকে বেড়ে হবে ৭১০ টাকা।
Lucky Strike: বর্তমানে ২০ শলাকার প্যাকেটেরর দাম ৮০ থেকে বেড়ে হবে ১০৩ মেক্সিকান পেসো। কর বৃদ্ধির বাংলাদেশি টাকায় ৫৪৪ টাকার লাকি স্ট্রাইক এর দাম হবে ৭০০ টাকা।
Benson & Hedges: বর্তমানে ২০ শলাকার প্যাকেটেরর দাম ৮৫ মেক্সিকান পেসো, যা কর বৃদ্ধির পরে ১০৬ পেসো হবে। বাংলাদেশি টাকায় এর বর্তমানের ৫৭৮ টাকার সিগারেট প্যাকেট কিনতে হবে ৭২০ টাকায়।
Pall Mall: বর্তমানে ২০ শলাকার প্যাকেটেরর দাম ৮০ থেকে মেক্সিকান পেসো। যা কর বৃদ্ধির পরে যা হবে ৯৬ পেসো। বাংলাদেশি টাকায় এর বর্তমান মূল্য ৫৪৪ টাকা থেকে বেড়ে হবে ৬৫৩ টাকা।
এ ছাড়াও মেক্সিকোতে বিক্রি বা আমদানি করা সিগারেট ছাড়া অন্যান্য সব নিকোটিনসমৃদ্ধ পণ্যের ওপরও ২০০ শতাংশ কর ধার্য করা হবে, যেখানে নির্দিষ্ট করের পরিমাণ নির্ধারিত হবে পণ্যে থাকা নিকোটিনের মিলিগ্রাম পরিমাণের ভিত্তিতে।
সবমিলিয়ে সুনির্দিষ্ট কর বৃদ্ধির ফলে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর দাম ২০–৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, যা ক্রেতাদের জন্য সরাসরি ব্যয় বৃদ্ধি করবে। মোটকথা, ২০২৬ সালের এই কর নীতি বাস্তবায়ন হলে মেক্সিকোর সিগারেট বাজারে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের দাম বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হবে। যা ভোক্তাদের দৈনন্দিন খরচে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে এবং এতে সিগারেটের ব্যবহার কমবেG বিপরীতে সরকার যে বাড়তি রাজস্ব পাবে তা দিয়ে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যায় মেটাতে সহায়তা করবে। যদি দেশটির কর কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছে, এই বৃদ্ধি কেবল রাজস্ব বাড়ানোর জন্য নয়; বরং তামাকের অর্থনৈতিক প্রাপ্যতা কমানো, যা ব্যবহার হ্রাসের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে স্বীকৃত বিশ্বজুড়ে।
সিগারেটের প্রতি শলাকায় ১ টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ জরুরি
সম্প্রতি সিগারেটে পর্যায়ক্রমে সুনির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ট্যাক্স বাড়িয়েছে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে মেক্সিকো সরকার। কর কাঠামোতে যে পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে, তা বিশ্বব্যাপী সিগারেটের কর কাঠামোর উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশও কর কাঠামোতে সুনির্দিষ্ট কর আরোপের দিকে যেতে পারে।
আগামী বাজেটেই ব্র্যান্ড নির্বিশেষে প্রতিটি সিগারেটে ১ টাকা করে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা সম্ভব। এতে বছরে বিএটি থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব পাওয়া যাবে। অন্যান্য কোম্পানি মিলিয়ে তা ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ যত শলাকা সিগারেট উৎপাদন হবে, তত টাকা বাড়তি রাজস্ব পাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এই ১ টাকা সুনির্দিষ্ট কর চালু হলে সব ধরনের সিগারেটের দাম শলাকা প্রতি ১ টাকা বাড়বে। আর এই বাড়তি দামের পুরোটাই সরকারের কোষাগারে জমা হবে। বাড়তি দাম থেকে কোম্পানি কোনো অংশ পাবে না। ফলে সিগারেটের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়বে, ব্যবহার কমবে, এবং সরকারের রাজস্ব বাড়বে। তামাক কোম্পানির বাড়তি মুনাফা করার সুযোগ থাকবে না।
চিনিযুক্ত কোমলপানীয়ের ওপর কর বৃদ্ধি করেছে দেশটি
মেক্সিকো সরকার ২০২৬ সালে চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর কর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। অতিরিক্ত চিনি যুক্ত পানীয়ের জন্য IEPS কর ১.৬৪ পেসো থেকে ৩.০৮ পেসো প্রতি লিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। আর নন-ক্যালোরিক সুইটনারযুক্ত পানীয়ের জন্য নতুন কর ধার্য করা হয়েছে ১.৫ পেসো প্রতি লিটার।
কর বৃদ্ধির প্রভাবে দেশটির বাজারে পানীয়ের দামও বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণস্বরূপ:
• ৬০০ মিলিলিটার Pepsi এর দাম পড়বে ২০ পেসো বাংলাদেশী টাকায় ১৩৬ টাকা।
• ১ লিটার Pepsi এর দাম হবে ২৫ পেসো যা বাংলাদেশী টাকায় ১৭০ টাকা।
কর বৃদ্ধির ফলে অতিরিক্ত চিনি যুক্ত এবং সুইটনারযুক্ত পানীয়ের দাম উভয় ক্ষেত্রেই বৃদ্ধি পাবে, যা ভোক্তাদের দৈনন্দিন খরচে প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের দেদারচ্ছে বিক্রি হচ্ছে হরেক রকম চিনিযুক্ত কোমল পানীয়।দাম অত্যন্ত কম হওয়ায় শিশুদের মধ্যে বাড়ছে এসব কোমল পানীর চাহিদা। কিন্তু সর্বত্র নাগলের মধ্যে বিশাল পরিমানে বিক্রি হলেও সরকার এখাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমানে রাজস্ব পায় না সরকার। চিনিযুক্ত এসব পণ্যে কর হার কম এবং বাজার তদারকি না থাকায় যত্রতত্র কর ফাঁকি দিয়ে সস্তায় বিক্রি হওয়ায় শিশুদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়া বাড়ছে। বাড়ছে স্বাস্থ্যক্ষতি। তাই মেক্সিকো সরকারের মতো বাংলাদেশেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোমল পানীয় এর উপর কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
মেক্সিকোর সরকার ২০২৬ সালে স্বাস্থ্যকর কর কার্যকর করে তামাক এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সিগারেটের উপর ধাপে ধাপে সুনির্দিষ্ট কর বৃদ্ধি, পণ্যের চূড়ান্ত দামের উপর প্রভাব এবং শিল্পজাত প্রভাব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এটি ভোক্তার আচরণ পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এই করনীতি শুধু রাজস্ব সংগ্রহ নয়, বরং অ-সংক্রামক রোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ লক্ষ্য করে গৃহীত হয়েছে।
বাংলাদেশেও ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ % অসংক্রামক রোগের জন্য দায়ী। এর পেছনে মূল কারণ হলো বিড়ি, সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত কোমল পানীয় সেবন এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার। ফলে মেক্সিকোর মতো বাংলাদেশেও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্য ও কোমল পানীয়ে দ্রুত সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করার তাগিদ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা।
লেখক: সুশান্ত সিনহা, সাংবাদিক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক


