বর্তমান সময়ে থাইরয়েডজনিত সমস্যা একটি অতি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হরমোনজনিত রোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গলার কাছে প্রজাপতি আকৃতির এই থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো-একই থাইরয়েড সমস্যায় কেউ অস্বাভাবিকভাবে মোটা হয়ে যান, আবার কেউ দ্রুত ওজন হারিয়ে ফেলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত প্রধান দুটি হরমোন-ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T3) ও থাইরক্সিন (T4)-এর ভারসাম্য নষ্ট হলেই শরীরের ওজনের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। এই সমস্যাকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
হাইপোথাইরয়েডিজম: ওজন বেড়ে যাওয়ার কারণ
যখন থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত হরমোন উৎপাদন করতে পারে না, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। এতে শরীরের মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায়। ফলে ক্যালরি ঠিকমতো পোড়াতে না পেরে শরীরে চর্বি জমতে থাকে।
এর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো-
১. শরীর ফুলে যাওয়া বা পানি জমে থাকা
২. অতিরিক্ত ক্লান্তি
৩. কোষ্ঠকাঠিন্য
৪. অল্প খাবার খেলেও দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া
৫. হাইপারথাইরয়েডিজম: ওজন কমে যাওয়ার কারণ
এর বিপরীত অবস্থাকে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিজম। এ ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হরমোন তৈরি করে। ফলে শরীরের মেটাবলিজম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং জমে থাকা চর্বি ও পেশি দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে।
এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. বুক ধড়ফড় করা
২. বেশি খিদে লাগলেও ওজন কমে যাওয়া
৩. অতিরিক্ত ঘাম
৪. অনিদ্রা বা রাতে ঘুম না আসা
৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেও সঠিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আয়োডিনযুক্ত খাবার: হাইপোথাইরয়েড থাকলে আয়োডিনযুক্ত লবণ ও সামুদ্রিক মাছ উপকারী। তবে হাইপারথাইরয়েডের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়োডিন গ্রহণ করা উচিত নয়।
সঠিক ব্যায়াম: হাইপোথাইরয়েডে কার্ডিও ব্যায়াম ওজন কমাতে সহায়ক। আর হাইপারথাইরয়েডে পেশি গঠনের জন্য স্ট্রেংথ ট্রেনিং প্রয়োজন।
পানি ও প্রোটিন: পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে সাহায্য করে।
নিয়মিত পরীক্ষা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই থাইরয়েডের ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। প্রতি ৩ থেকে ৬ মাস অন্তর TSH পরীক্ষা করে ওষুধের ডোজ ঠিক করা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েডজনিত ওজনের তারতম্য শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়; এটি শরীরের ভেতরের বিপাকীয় বিশৃঙ্খলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সঠিক চিকিৎসা, ডায়েট ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে এনে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।


