ঢাকাবুধবার , ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

আম চাষে লোকসান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষকদের নতুন ভরসা বরই

নিজস্ব প্রতিবেদক
জানুয়ারি ১৪, ২০২৬ ১২:২৪ অপরাহ্ণ । ৮০ জন

আমের রাজধানী হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষি ও অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে আমনির্ভর ছিল। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টি, রোগবালাই, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আম চাষে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প ও লাভজনক ফসল হিসেবে বরই চাষের দিকে ঝুঁকছেন জেলার শত শত কৃষক।

বর্তমানে জেলায় চায়না, বল সুন্দরী, বোম্বাই ফুলী, ডায়মন্ড, বাউকুল, থাই, বেবি সুন্দরী ও ভারত সুন্দরীসহ বিভিন্ন জাতের বরইয়ের চাষ হচ্ছে। তুলনামূলক কম পরিচর্যা, স্বল্প খরচ ও দ্রুত ফলন পাওয়ায় বরই চাষ কৃষকদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। অনেকেই আম বাগানের ফাঁকে ফাঁকে কিংবা দীর্ঘদিন পতিত জমিতে বরই চাষ শুরু করেছেন।

বরই বিপণনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের মির্জাপুর এলাকার বরইয়ের হাট। প্রতিদিন দুপুরের পর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পাশের জেলা থেকে কৃষকেরা ভ্যান ও পিকআপে করে ক্যারেটভর্তি বরই নিয়ে হাটে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আলি আসরাফ বলেন, “প্রতিদিন দুপুর ১২টার পর থেকেই কৃষকদের ভিড় বাড়তে থাকে। আড়তদাররা বরই বাছাই করে কিনে নেন। এখান থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বরই পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রতি মণ বরই সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”

বরই চাষ করে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন অনেক কৃষক। শিবগঞ্জ উপজেলার বরই চাষি তারেক রহমান বলেন, “জন্মের পর থেকেই আমি আম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কয়েক বছর ধরে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব, খরচ বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আম চাষে ধারাবাহিক লোকসান হয়। এতে আমরা চরম সংকটে পড়ে যাই।”

তিনি আরও বলেন, “বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে অল্প জমিতে বরই চাষ শুরু করি। ফলন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় এখন আশাবাদী। বরই চাষে খরচ কম, সময় কম লাগে এবং দ্রুত লাভ পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে আরও জমিতে বরই চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।”

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রায় ৫৬০ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, “আম চাষে লোকসান হওয়ায় অনেক কৃষক বরই চাষের দিকে ঝুঁকছেন। মির্জাপুর হাটে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার বরই বেচাকেনা হয়। বরই একটি লাভজনক ফসল এবং এটি কৃষকদের বিকল্প আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠছে।”

তিনি জানান, আধুনিক চাষপদ্ধতি, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বরই চাষ ভবিষ্যতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও রপ্তানি উদ্যোগ জোরদার করা হলে বরই চাষ শুধু কৃষকদের ভাগ্য বদলাবে না, বরং আমনির্ভর অর্থনীতির বাইরে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য নতুন কৃষি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।