ঢাকাসোমবার , ২২ ডিসেম্বর ২০২৫

শ্যামনগরে কৃষি জমি রক্ষায় লবণ ও চিংড়ি–কাঁকড়া চাষ বন্ধের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ২২, ২০২৫ ১১:১১ পূর্বাহ্ণ । ১৯৯ জন

উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের আগ্রাসন দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এর ফলে ফসলি জমি ধ্বংস, মাটির উর্বরতা হ্রাস, পানীয় জলের সংকট এবং কৃষিনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় এই অনিয়ন্ত্রিত চাষ বন্ধের দাবি জোরালো হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে শ্যামনগরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার (২১ ডিসেম্বর) কোস্ট ফাউন্ডেশন ও উদয়ন বাংলাদেশ যৌথভাবে শ্যামনগর উপজেলার নওয়াবেঁকি বাজারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের জন্য কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে দেওয়া ফসলি জমি ধ্বংস করছে, মাটির উর্বরতা কমাচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন উদয়ন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শেখ আসাদ। কোস্ট ফাউন্ডেশনের এম. এ. হাসানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন শ্যামনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সামিউল ইসলাম মনির, সাবেক ইউপি সদস্য এম. এম. শওকত হোসেন, উন্নয়নকর্মী ইমরান পারভেজ, গণচেতনা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শিবু প্রসাদ বৈদ্য, ভুক্তভোগী নারী প্রতিনিধি নাজমা আবু ও ঝরনা খাতুনসহ অন্যান্যরা।

কোস্ট ফাউন্ডেশনের এম. এ. হাসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের পাশাপাশি চিংড়ি ও কাঁকড়ার ঘের এই অঞ্চলকে কৃত্রিমভাবে লবণাক্ত করে পরিবেশগত বিপর্যয় বাড়াচ্ছে। কিছু মানুষের লাভ হলেও এর ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে এবং বহু মানুষের জমি, খাদ্য ও জীবিকা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি কৃষি জমি সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এর কঠোর বাস্তবায়নের দাবি জানান।

উদয়ন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শেখ আসাদ বলেন, শ্যামনগর ও সাতক্ষীরায় লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন ও জমির গঠন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কৃষকেরা জমি ও বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র জীবিকার সন্ধানে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য মাসিক ভাতা, স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং বিকল্প জীবিকার সহায়তার দাবি জানান।

শ্যামনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সামিউল ইসলাম মনির অবৈধ খালের ইজারা বাতিল ও অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, কৃষিতে ফিরে যেতে হবে এবং এক ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে।

গণচেতনা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শিবু প্রসাদ বৈদ্য বলেন, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের সঙ্গে সঙ্গে খাবার পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এখনই কঠোর নীতিমালার আওতায় না আনলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হবে।

ভুক্তভোগী নারী প্রতিনিধি ঝরনা খাতুন বলেন, লবণাক্ততার কারণে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে, খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে এবং অপুষ্টি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি বেকারত্ব, পুরুষশূন্য পরিবার, বাল্যবিয়ে ও সামাজিক অপরাধও বাড়ছে। টেকসই সমাধানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তারা কৃষি জমিতে লবণ, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ, কার্যকর আইন প্রয়োগ, স্থানীয় জনগণের সম্মতি ছাড়া ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।