বাংলাদেশ আজ এক বিশেষ জনসংখ্যাগত পর্ব অতিক্রম করছে। বর্তমানে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি। জনমিতি বিজ্ঞানের ভাষায় এটি হলো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। সুযোগটি সাময়িক—এখন সঠিক বিনিয়োগ ও নীতি সহায়তা দিলে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA)-এর তথ্যমতে—দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মক্ষম বয়সে (১৫–৬৪ বছর) রয়েছে।২০২১ সালের আদমশুমারিতে গড় বয়স দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭.৬ বছর।প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ তরুণ-যুবক বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে।
অনুমান করা হচ্ছে, আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা ভোগ করবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষ শ্রমশক্তি কাজে লাগানো গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে আরও ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি, যাদের বড় অংশ তরুণ। তাদের পাঠানো আয় বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সার রপ্তানিকারক দেশ। তরুণ উদ্যোক্তারা ই-কমার্স, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনে নতুন দিগন্ত তৈরি করছেন।শিক্ষা, নারীর অংশগ্রহণ, স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম দৃশ্যমান অগ্রগতি আনছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে—
প্রতিবছর শ্রমবাজারে ২০ লাখ যুবক প্রবেশ করছে, কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র ১২–১৩ লাখের জন্য।আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্যমতে, বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ তরুণ কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখনও মাত্র ৪২ শতাংশ।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বিগ ডেটা—এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনে আমরা এখনও পিছিয়ে।
মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে।
কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি।
নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সমান সুযোগের মাধ্যমে।
স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তরুণদের নীতি নির্ধারণ ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
সবশেষে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কোনো স্থায়ী সম্পদ নয়। সময় সীমিত, সুযোগও ক্ষণস্থায়ী। তরুণ সমাজকে দক্ষ, কর্মক্ষম ও উদ্ভাবনী শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে বাংলাদেশ হবে উন্নত রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রী। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে এই সম্পদই রূপ নেবে সামাজিক চাপ ও বেকারত্বের বোঝায়। এখনই সময়—তারুণ্যের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার।
সবুজ কুমার মহন্ত, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী


